নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
‘জামায়াতে ইসলামীতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ নেতা হন না। আপনারা তো রাজনীতি নিয়ে অনেক গবেষণা করেন, একটি উদাহরণ দেখান যেখানে জামায়াতের কোনো নেতা উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্ব পেয়েছে’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেয়ার সময় এই মন্তব্য করেন গুমের শিকার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী।
গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য দেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি ‘আয়নাঘরের’ রোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন।
জবানবন্দিতে আযমী জানান, ২০১৬ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে তাকে তিনবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গোয়েন্দারা মূলত জানতে চেয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সাথে তার সম্পর্ক আছে কি না। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করার সাত বছর দুই মাস পর আপনারা অপহরণ করেছেন। দীর্ঘ সময় আপনাদের গোয়েন্দা বাহিনী আমার পেছনে ঘুরেছে। জামায়াতের সাথে আমার ন্যূনতম সম্পর্কের কোনো রিপোর্ট কি আপনাদের কাছে আছে?’
তিনি আরো বলেন, গোয়েন্দারা তাকে জামায়াতের আমির হওয়ার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করতে চাপ দিচ্ছিলেন। তখন তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, তার বাবা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির হলেও দলটির সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি নিয়ে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, ‘ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি অপরাধ হলে আদালতে সোপর্দ না করে অবৈধভাবে আটকে রেখেছেন কেন? সেনাবাহিনীর ৩০ বছরের চাকরি আমাকে শিখিয়েছে যে ভারত আমাদের প্রধান শত্রু। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ভারতকে কখনো বন্ধুসুলভ আচরণ করতে দেখিনি।’
আযমী জানান, জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) বন্দী থাকাকালে তাকে যে তোষক দেয়া হয়েছিল, তাতে শত শত ছারপোকা ছিল। ছারপোকার কামড়ে শরীর ও কাপড় রক্তাক্ত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামাজ পড়তে সমস্যার কথা জানিয়ে আলাদা লুঙ্গি চাইলেও দেয়া হয়নি। তাকে দেয়া নিম্নমানের পোশাক ছিঁড়ে গেলে দর্জিও সেলাই করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। নিজের হাতে সেলাইয়ের জন্য সুঁই-সুতা চেয়েও পাননি তিনি। বাধ্য হয়ে ছেঁড়া জায়গায় গিট্টু দিয়ে কাপড় ব্যবহার করতে হতো।
২০১৬ সালের ২২ আগস্ট গুম হওয়ার এক মাস পর ২১ সেপ্টেম্বর এক কর্মকর্তা আযমীকে বলেন যে, অঘটনের আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় তাকে মুক্তি দেয়া হবে। তবে সেই মুক্তি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো দীর্ঘ আট বছর। ওই কর্মকর্তা তাকে বলেছিলেন, ‘আপনি একজন জেনারেল, আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসতে হবে।’ ৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে টানা দুই দিন সাক্ষ্য দিয়ে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মুক্তির আগে ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বরের পর তাকে আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
আযমী ট্রাইব্যুনালকে জানান, তিনি যেখানে আটকে ছিলেন সেই কক্ষটি শনাক্ত করতে পেরেছেন। তার সেলের দক্ষিণে ঢাকা স্টেশন অফিসার্স মেস-বি অবস্থিত ছিল, যা তিনি ভেন্টিলেটর দিয়ে দেখতে পেতেন। পরবর্তীতে নিশ্চিত হন এটিই ডিজিএফআই-এর জেআইসি বা ‘আয়নাঘর’। তিনি অভিযোগ করেন, গত ৫ আগস্টের পর আয়নাঘরের আলামত নষ্ট করতে ভেন্টিলেটর বন্ধ করে দেয়াল ভাঙা হয়েছে এবং লোহার গ্রিলের বদলে কাঠের দরজা লাগিয়ে পরিবেশ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে।
আট বছরের অবৈধ বন্দিত্বে নিজের ও পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির কথা উল্লেখ করে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, তার ফেরার প্রতীক্ষায় অসুস্থ বিধবা মা মারা গেছেন এবং স্ত্রী-সন্তানরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটিয়েছেন। বর্তমান সেনাপ্রধানের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ডিজিএফআইয়ের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট তিন জেনারেলকে ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আযমী এই অমানুষিক নির্যাতনের জন্য দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সুবিচার প্রার্থনা করেন।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম জানান, আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি আযমীকে জেরার দিন ধার্য করেছেন আদালত। ১৩ জন আসামির মধ্যে ১২ জনই সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা।



