২০ জানুয়ারি চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা মামলার রায়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • এই মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবসহ আটজন আসামি
  • হাইপ তৈরি করে গুমের বিচারের দৃষ্টি অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা : চিফ প্রসিকিউটর

রাজধানীর চানখাঁরপুলে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণে ছয়জনের মৃত্যু ও বহুজনের আহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আগামী ২০ জানুয়ারি রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন। এই মামলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে যুক্তি, পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষ হয়েছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ মামলার রায়ের দিন ধার্য করেন। অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এ দিন ইমাজ হোসেন ইমনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী মো: জিয়াউর রশিদ। পরে পলাতক চার আসামির হয়ে যুক্তি তুলে ধরেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী কুতুবউদ্দিন আহমেদ। প্রসিকিউশনের পক্ষে পাল্টা যুক্তি খণ্ডন করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ অন্যরা।

এর আগে, ২২ ডিসেম্বর আংশিক যুক্তিতর্ক শেষ করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। বাকি শুনানির জন্য আজকের দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন যুক্তি উপস্থাপন করেন শাহবাগ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) মো: আরশাদ হোসেনের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি। এরপর কনস্টেবল সুজন ও নাসিরুলের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ ও আবুল হাসান। যুক্তিতর্কে নিজেদের ক্লায়েন্টের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ আনতে পারেনি বলে জানিয়েছেন তারা।

এ মামলার গ্রেফতার চার আসামি হলেন- শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো: আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল মো: সুজন মিয়া, মো: ইমাজ হোসেন ইমন, মো: নাসিরুল ইসলাম। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের বুধবার সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। পলাতকরা হলেন- ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো: আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল। চলতি বছরের ১৪ জুলাই আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।

এর আগে, ১৫ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি এ মামলার আদ্যোপান্তসহ গত বছরের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলের ঘটনায় আসামিদের কে কোন অপরাধ করেছেন, কার কতটুকু সংশ্লিষ্টতা ছিল; সব তুলে ধরেন। ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের সরাসরি নির্দেশে ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। সবশেষ আট আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রার্থনা করেন এই প্রসিকিউটর।

১০ ডিসেম্বর এ মামলার আসামি আরশাদ হোসেনের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন জুয়েল মাহমুদ। ৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে নিজের পক্ষে নিজেই সাফাই সাক্ষ্য দেন আরশাদ হোসেন। একই দিন জবানবন্দী দিয়েছেন মো: সোলাইমান। ৩০ নভেম্বর আরশাদ হোসেনের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য নেয়ার আবেদনের ওপর শুনানি করেন আইনজীবী অভি। পরে তার আবেদন মঞ্জুর করে তিনজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়ার অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনাল। ২৭ নভেম্বর এ আবেদন করেন তিনি।

একই দিন এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আট আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো: মনিরুল ইসলামের জেরা শেষ করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ১৯ নভেম্বর টানা তৃতীয় দিনের মতো তার সাক্ষ্য শেষ হয়। জবানবন্দী শুরু হয় ১২ নভেম্বর। সবমিলিয়ে ২৩ কার্যদিবসে ২৬ জনের সাক্ষ্য-জেরা সম্পন্ন হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালায় পুলিশ। এতে বহু হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, মো: ইয়াকুব, মো: রাকিব হাওলাদার, মো: ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন।

হাইপ তৈরি করে গুমের বিচারের দৃষ্টি অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা

এ দিকে গুমের মামলা নিয়ে গতকাল সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাইপ তৈরি করে গুমের বিচারের দৃষ্টি অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

বুধবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা বারবার বলার চেষ্টা করেছি আদালতের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। কিন্তু আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি (ক্লেইম) করার চেষ্টা করেছিলেন যে, তিনি একজন সিনিয়র আইনজীবী। অথচ আমরা রেকর্ড ঘেঁটে দেখলাম তিনি ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হয়েছেন। অথচ দাবি করছেন তিনি একজন সিনিয়র আইনজীবী। তাকে রেসপেক্ট (সম্মান) করতে হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার-১৯৭২-এ বলা আছে, যেটার মাধ্যমে আইনজীবীদের শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়। সেখানে আর্টিকেল ২৬-এ খুব পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে- চিফ প্রসিকিউটর অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ ধারণ করেন। তাকে সেই পদমর্যাদা দেয়া হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল যখন কোনো আদালতে শুনানির জন্য দাঁড়াবেন, তখন কোনো আইনজীবী আর দাঁড়াতে পারবেন না। অর্থাৎ আমি যখন কোর্টে যুক্তিতর্কের জন্য দাঁড়াব, সেখানে অন্য পক্ষের যত আইনজীবী থাকুক- সিনিয়র বা জুনিয়র হোক; আমি দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় কোনো আইনজীবী কথা বলতে পারবেন না। এটাই হচ্ছে আইন। আমি বসে গেলে তখন তারা তাদের আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক করতে পারবেন। কিন্তু তারা সেই ডিসেন্সিটা (শিষ্টাচার) রক্ষা করেননি। উল্টো গণমাধ্যমের সামনে অভিযোগ করেছেন তিনি সিনিয়র আইনজীবী। তাকে মর্যাদা দেয়া হয়নি। এটা হচ্ছে একধরনের হাইপ তৈরি করে এ বিচারের দৃষ্টি অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা ।

তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে হাজারো মানুষকে গুম করা হয়েছে। তাদের মধ্যে শত শত মানুষকে গুমপূর্বক হত্যা করে লাশ বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল, সাগরে, জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়েছে। এমন কঠিন মামলার বিচার যখন হচ্ছে, আসামিরা বারবার তাদের পরিচয়... তারা যখন পুলিশ হিসেবে এই অপরাধটা করেছেন, র‌্যাবে থেকে করেছেন, সেই জিনিসটা ভুলে গিয়ে বারবার তারা বলার চেষ্টা করছেন আমরা সেনাবাহিনীর অফিসার। অথচ সেনাবাহিনীর বিচার এখানে হচ্ছে না। তারা যখন অপরাধগুলো করেছেন তারা কখনো সেনা কমান্ডের অধীনে ছিলেন না। সেনাবাহিনীর পোশাকে ছিলেন না। শৃঙ্খলার মধ্যে ছিলেন না। তারা ছিলেন পুলিশ সদস্য। অথচ এই সেনা পরিচয়কে বাইরে ব্যবহার করার মাধ্যমে তারা মামলাটাকে সেন্সেটাইজ করার চেষ্টা করেছেন। এটা অসৎ উদ্দেশ্যে করছেন আসামিপক্ষের এই আইনজীবীরা।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশের পর সূচনা বক্তব্যের তারিখ ঘিরে বাদানুবাদের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন আদালত।