বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষার নতুন রূপরেখা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামে একটি বৃহৎ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত এই উদ্যোগকে দলটি দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরছে। যদিও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে, তবু সামাজিক সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসূচিটি ইতিবাচক সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে।

মঈন উদ্দিন খান
Printed Edition

সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামে একটি বৃহৎ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত এই উদ্যোগকে দলটি দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরছে। যদিও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে, তবু সামাজিক সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসূচিটি ইতিবাচক সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে।

বিএনপির ঘোষণায় বলা হয়েছে, দলটি ক্ষমতায় এলে ধাপে ধাপে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০ লাখ অতি দরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। কার্ডটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা জোরদার করবে বলে মনে করছে দলটি।

পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তার ধারণা : ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রতিটি পরিবারকে মাসিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা অথবা সমপরিমাণ খাদ্যসামগ্রী দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, এই সহায়তা কেবল ভাতা হিসেবে নয়, বরং পরিবারকে ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা দিয়ে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেয়ার একটি উপায়।

দলটির নেতারা বলছেন, নিয়মিত সহায়তা পেলে দরিদ্র পরিবারগুলো সন্তানদের শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা বা আয়বর্ধক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।

নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্ব : ফ্যামিলি কার্ডের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো এটি পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করার পরিকল্পনা। বিএনপির মতে, এতে নারীর আর্থিক ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। গ্রামীণ ও নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোতে নারীরা অনেক সময় পরিবারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পান না। এই উদ্যোগ নারীদের সেই ভূমিকা আরো শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন ভাবনা : বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য একটি অর্থায়ন পরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভর্তুকি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে এই কর্মসূচির ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। তাদের মতে, সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয়কে খরচ নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গঠনে সহায়তা করবে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রাজনৈতিক বিতর্ক : ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ঘোষণার পর নির্বাচনের মাঠে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো এটিকে নির্বাচনের আগে দেয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখলেও, অন্যদিকে বিএনপি বলছে এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের অংশ।

সমালোচকদের মূল প্রশ্ন তিনটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত। প্রথমত, এত বড় কর্মসূচির অর্থায়ন কিভাবে টেকসই হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নির্ভুল হবে। তৃতীয়ত, ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় এমন কর্মসূচি ঘোষণার বাস্তবিক আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি কতটা শক্ত।

জামায়াতে ইসলামীর কোনো কোনো নেতা বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড ভুয়া ও বাস্তবসম্মত নয়। কয়েকটি জনসভায় জামায়াত নেতারা বলেছেন, মানুষ ফ্যামিলি কার্ড বা ফ্ল্যাট চায় না, বরং নিরাপদ জীবন চায়।

এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ডসহ এরকম প্রতিশ্রুতি ভোট কেনার কৌশল। তিনি বলেছেন, জনগণ এখন এমন প্রতিশ্রুতিতে আর বিভ্রান্ত হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, দরিদ্ররা কি আসলেই এই অর্থ পাবে, নাকি সেটা বিভাজিত হবে বা বদলালে অন্যভাবে ব্যবহার হবে? এই ধরনের প্রতিশ্রুতিগুলোকে তিনি ভুয়া আশ্বাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে, ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তার কয়েক দশকের সুবিস্তৃত, সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত পলিসিগুলো বাস্তবায়ন করবেন। তিনি নিশ্চিত করবেন একটি জবাবদিহিমূলক, দায়বদ্ধ ও স্বচ্ছ সরকার। সেই সরকার কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করবে যে জনগণই রাষ্ট্রের সত্যিকারের মালিক, জনগণই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।