লোকসান কমাতে বিদ্যুতের দামে সমতা চায় ডেসকো-ওজোপাডিকো

কোম্পানি দু’টি গত অর্থবছরে ৫০৫ কোটি ৫৬ টাকা ও ২০৮ কোটি টাকার নিট লোকসান গুনেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

লোকসানের চক্র থেকে বের হতে পারছে না ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো)। কোম্পানি দু’টি গত অর্থবছরে ৫০৫ কোটি ৫৬ টাকা ও ২০৮ কোটি টাকার নিট লোকসান গুনেছে। এবার এ লোকসান কমাতে কোম্পানি দু’টি ৩৩ কেভিতে পাওয়া বিদ্যুতের দাম অন্যান্য কোম্পানির সমান করার প্রস্তাব করেছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে লিখিত আবেদনও করেছে।

ডেসকোর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৭ সাল থেকে বিদ্যুতের পাইকারি দরে এই পার্থক্য বিদ্যমান। তখন কোম্পানিগুলোর রাজস্ব চাহিদা এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের রাজস্ব বিবেচনায় ওই আদেশ দেয়া হয়। তখন ডিপিডিসি কিছুটা পিছিয়ে থাকায় তুলনামূলক তাদের দাম কম। একইভাবে নতুন কোম্পানি নেসকো কিছুটা বাড়তি সুবিধা পায় স্বনির্ভর হওয়ার জন্য। তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে দাম বৃদ্ধি হলেও কোম্পানি ভেদে পার্থক্য রয়ে গেছে। ৩৩ কেভিতে ডিপিডিসির তুলনায় ইউনিটপ্রতি প্রায় ৩ পয়সা হারে বাড়তি বিল দিচ্ছে ডেসকো। ডিপিডিসি ইউনিটপ্রতি বিল দিচ্ছে ৮.৫৬০০ টাকা হারে। একই স্তরে ডেসকোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে ৮.৫৮৮০ দরে। অন্য দিকে নেসকোর তুলনায় ৪২ পয়সা হারে বেশি বিল দিতে হচ্ছে ওজোপাডিকোকে। নেসকো ইউনিটপ্রতি ৭.০৪ টাকা হারে বিল দিলেও ওজোপাডিকো দিচ্ছে ৭.৪৬ টাকা।

ওজোপাডিকোর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির সাথে আমাদের গ্রাহকের প্যাটার্ন একই কিন্তু আমাদের ৩৩ কেভিতে বিদ্যুতের পাইকারি দর তাদের তুলনায় বেশি। নেসকো ইউনিটপ্রতি ৭.০৪ টাকা একই ধাপে আমাদের পরিশোধ করতে হচ্ছে ৭.৪৬ টাকা। ওজোপাডিকোর ওই দর ২০২৪ সালের সর্বশেষ নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী। ২০২০ সালের আদেশে ৩৩ কেভিতে নেসকোর ইউনিটপ্রতি দাম ছিল ৫.০৫ টাকা। তখন ওজোপাডিকোকে পরিশোধ করতে হতো ৫.৩৭ টাকা দরে। গত অর্থবছরে আমাদের কোম্পানির নিট লোকসান হয়েছে ২০৮ কোটি টাকা। সে কারণে আমরা নেসকোর সমান দর নির্ধারণ করার জন্য বিইআরসিতে চিঠি দিয়েছি। বিইআরসি বলেছে, গণশুনানি ছাড়া ট্যারিফ পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই। ট্যারিফ পরিবর্তন চাইলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন দিতে হবে। আমরা এখনো আবেদন জমা দেইনি।

এ দিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ইউনিটপ্রতি দর ৫.১৭ টাকা থেকে ৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে ৮.৫৮ টাকা করার আবেদন করেছিল। বিইআরসি ২০২২ সালের ১৮ মে সেই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি গ্রহণ করে। বিপিডিবির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব ১৩ অক্টোবর নাকচ করে দেয় বিইআরসি। রিভিউ আবেদন জমা দিলে পাইকারি দাম প্রতি ইউনিট (১৯.৯২ শতাংশ) ৫.১৭ টাকা বাড়িয়ে ৬.২০ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি।

পাইকারি দাম বৃদ্ধির পরেই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দেয় বিতরণ কোম্পানিগুলো। সেই প্রস্তাবের ওপর ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি গণশুনানি গ্রহণ করে বিইআরসি। শুনানি পরবর্তী লিখিত মতামত দেয়ার জন্য ১৫ জানুয়ারি সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে দাম বাড়ানোর চাপ দেয়া হয়। বিইআরসির তৎকালীন কমিশন এতে সায় না দিলে নির্বাহী আদেশে ১২ জানুয়ারি ৫ শতাংশ দাম বাড়িয়ে দেয় সরকার। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে আরেক দফায় পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় নির্বাহী আদেশে। বিতরণ কোম্পানিগুলো তার পর থেকেই বলে আসছে, দুই দফায় যে হারে পাইকারি দাম (১৯.৯২ ও ৫ শতাংশ) বেড়েছে, সে হারে খুচরা দাম বাড়েনি। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুই দফায় ৫ শতাংশ হারে দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে তাদের লোকসান দিতে হচ্ছে। তারা গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।

প্রসঙ্গত, ঢাকা শহরের উত্তরাংশে বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে ডেসকো, ঢাকার দক্ষিণাংশের বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসির সমান করা আর খুলনা, বরিশাল অঞ্চলের বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওজোপাডিকো রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের বিতরণ কোম্পানি নেসকোর সমান বিল করার আবেদন করেছে। চিঠিতে তারা বলেছে, তাদের গ্রাহকদের যে ধরন ও স্তর সেই একই ধরন ওই কোম্পানি দু’টির। তাই পাইকারি বিদ্যুতের দর একই সমান হওয়া উচিত।