মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে তারেক রহমানের বৈঠক

শ্রমবাজার কৌশলগত বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা

Printed Edition
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ফাঁকে একান্ত আলাপচারিতায় তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিম : পিআইডি
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ফাঁকে একান্ত আলাপচারিতায় তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিম : পিআইডি

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ কুয়ালালামপুর (মালয়েশিয়া) থেকে

মাত্র ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত নিবিড় ও কর্মব্যস্ত এক কূটনৈতিক সফরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরেই তিনি শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মালয়েশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছেন।

সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার দ্রুত পুনরায় চালুর আহ্বান। পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে একান্ত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানান। একই সাথে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বাংলাদেশী কর্মীদের বৈধকরণ এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানেও সহযোগিতা কামনা করেন।

সফর শেষে সোমবার কুয়ালালামপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তিনি জানান, সফরের ফল হিসেবে দুই দেশ ৯টি বিষয়ে ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করবে।

লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

রোববার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা: জুবাইদা রহমানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লালগালিচা সংবর্ধনা এবং গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

সোমবার সকালে পুত্রাজায়ার পারদানা পুত্রায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে একান্ত বৈঠকে অংশ নেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। পরে দুই দেশের প্রতিনিধিদল নিয়ে সীমিত পরিসরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, পর্যটন ও জনশক্তি খাতের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশী কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি রফতানি এবং বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে।

চুক্তি ও সমঝোতায় নতুন গতি

দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা দলিল স্বাক্ষর ও বিনিময় করা হয়।

দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরো গভীর করতে একটি সাংস্কৃতিক সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবেলায় সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে দুটি ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ বিনিময় করা হয়।

একই সাথে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার জন্য একটি ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) বিনিময় করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।

আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যাহ্নভোজ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। পুত্রাজায়ায় তার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দুই প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীরাও উপস্থিত ছিলেন।

মধ্যাহ্নভোজের পর অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার শিল্পীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা করেন। অনুষ্ঠানে স্কুলশিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ পরিবেশন করলে উপস্থিত অতিথিরা তা উপভোগ করেন।

অনুষ্ঠান শেষে দুই দেশের জাতীয় পতাকা হাতে মালয়েশিয়ার শিশু-কিশোররা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা: জুবাইদা রহমান শিশুদের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।

করপোরেট জায়ান্টদের সাথে বৈঠক

সংক্ষিপ্ত সফর হলেও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। কুয়ালালামপুরের শাংগ্রি-লা হোটেলে মালয়েশিয়ার পাঁচটি শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল পেট্রোনাস (জ্বালানি), আজিয়াটা (টেলিযোগাযোগ), এয়ার এশিয়া (বিমান পরিবহন ও পর্যটন), পারোডুয়া (অটোমোবাইল) ও এমএমসি পোর্ট (বন্দর ও অবকাঠামো)।

বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি সহযোগিতা, বন্দর উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব বৈঠক ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে ঐকমত্য

দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, মানবপাচার প্রতিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধানে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থন কামনা করা হয়। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যু এবং আসিয়ান অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।

চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী

মালয়েশিয়া সফর শেষ করে সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিমানবন্দরের বুঙ্গা রায়া ভিভিআইপি কমপ্লেক্সে তাকে বিদায় জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলফিকলি হাসান। এ সময় বাংলাদেশ হাইকমিশনার মনজুরুল করিম ও ডেপুটি হাইকমিশনার শাহানারা মলিকাও উপস্থিত ছিলেন।

সামার ডাভোসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব

চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্মেলনে তিনি বৈশ্বিক অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বিভিন্ন অধিবেশনে অংশগ্রহণ করবেন।

২৩ জুন ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নেতৃত্ব’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে তার। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।

বেইজিংয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

২৪ জুন দালিয়ান থেকে বেইজিং পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে অংশ নেবেন। প্রায় এক শ’ চীনা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক নেতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিতব্য এই ফোরামে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে।

২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ও বিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

২৬ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আঞ্চলিক কৌশলগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ধারাবাহিক উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।