অপরিকল্পিত নগরায়নে মৃতপ্রায় রাজধানীর খাল

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

  • ১২ শতাংশের জলাধারের জায়গায় আছে ৩ শতাংশ
  • অবৈধ দখল ও দূষণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে পরিবেশে
  • হ্রাস পাচ্ছে বৃষ্টির পানির ধারণক্ষমতা

অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে রাজধানীর অধিকাংশ খাল ও জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। অবশিষ্টগুলোও প্রায় মৃত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল ও জলাভূমির বেদখল প্রক্রিয়া এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ঢাকার ভবিষ্যৎকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করছে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই যেখানে-সেখানে বড় বড় দালান ও অবকাঠামোর কারণে এসব জলাশয় হুমকির মধ্যে পড়েছে। ছোটখাটো খাল-ডোবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অতি প্রয়োজনে কিছুটা লোপাট হলেও বড় বড় জলাশয়ও ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। ঢাকার খালগুলো এক সময় ছিল পণ্য পরিবহনে অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন, লাগামহীন দখল ও চরম দূষণের কারণে সেই খালগুলো আজ মৃতপ্রায়, কোনো কোনোটির অস্তিত্ব আছে শুধু পুরনো মানচিত্রে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর পান্থপথ খালটি ধানমন্ডি লেককে হাতিরঝিল লেকের সাথে সংযুক্ত করতো। এখন পান্থপথ রোডের নিচে খালটি চাপা পড়ে গেছে। এটি দিয়ে এক সময় বৃষ্টির পানি বেগুনবাড়ি খালে প্রবাহিত হতো। আরেকটি জলাশয় ছিল পরীবাগ খাল। যেটি শাহবাগ থেকে মগবাজার হয়ে প্রবাহিত হতো। এখন এটি সোনারগাঁও সড়কের কারণে হারিয়ে গেছে। এক সময়ের প্রধান জলাধার হিসেবে বিবেচিত আরামবাগ ও গোপীবাগ খালও ভরাট হয়ে গেছে। একইভাবে রাজাবাজার ও নন্দীপাড়া-ত্রিমোহিনী খাল বক্স কালভার্টে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিশেষ করে একটি দীর্ঘ খাল, যা মৎস্য ভবন এলাকা থেকে প্রবাহিত হয়ে বেশ বিখ্যাত এলাকার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতো। এটিও কালের পরিক্রমায় সড়কে রূপান্তরিত হয়েছে। ধোলাইখাল ও দয়াগঞ্জ খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ধোলাইখাল-দয়াগঞ্জ-মিরহাজিরবাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি কাঁঠালবাগান ও ধলপুর খালও একই পরিণতি পেয়েছে। এ জায়গাগুলো এখন জমি ও অবকাঠামো তৈরি করে দখল করা হয়েছে।

অথচ প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী, কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। কোনো ব্যক্তি এ বিধান লঙ্ঘন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

রাজধানীর বেশ কিছু খালে ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের খালগুলোতে এখন স্বাভাবিক পানির প্রবাহ নেই। খাল দখল করে দোকান ও ভবন তৈরির ফলে নালাতে রূপ নিয়েছে। গৃহস্থালি বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিক, বাজারের ময়লা, হাসপাতালের আবর্জনা ও শিল্পকারখানার তরল বর্জ্যে খালের পানি কালো হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও খাল এতটাই ভরাট যে, তা আর খাল হিসেবে চেনার উপায় নেই। পানির ওপর ভাসছে আবর্জনা, নিচে জমেছে পলিথিন ও পচা বর্জ্য। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

এ দিকে রাজধানীতে খাল ও জলাশয় রক্ষায় প্রতিবছরই জাতীয় বাজেট ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া হয় খাল খনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্প। বাজেট বক্তৃতা ও পরিকল্পনায় দেয়া হয় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আশ্বাস। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খালগুলোর দূষণ ও দখলমুক্ত করতে না পারায় অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি জমে যাচ্ছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ৫০টি খাল রয়েছে। কিন্তু দুই সিটি করপোরেশন দাবি, ঢাকায় খাল রয়েছে ৪৬টি। বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২৬টি খালের দায়িত্বে রয়েছে। অন্যগুলো গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রয়েছে।

রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় দেখা যায় যে, ঢাকায় ১৯৪০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গত ৮৩ বছরে ১২০ কিলোমিটার (৩০৭ হেক্টর) খাল হারিয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবহেলার কারণে ৯৫টি খাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। অন্য দিকে মাত্র ১১টি খাল ও চারটি লেক নতুন করে খনন করা হয়েছে। আরডিআরসি ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের ক্যাডাস্ট্রাল জরিপগুলোকে ২০২২ সালের স্যাটেলাইট ইমেজের সাথে তুলনা করেছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকার ৭৭টি প্রধান খাল ও লেক চিহ্নিত করে। এ জলাশয়গুলো মোট ৫৬৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে ছিল। যার প্রায় ৫৫ ভাগ এখন হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে অবকাঠামো, ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশে কৃষিজমি ও ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানারসের (বিআইপি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিগত ৯ বছরে ঢাকার মহানগর ও এর আশপাশে কমপক্ষে তিন হাজার ৪৮৩ একর জলাশয় এবং নিম্নভূমি ভরাট হয়েছে এবং ২০১০ সালে প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ঢাকার ৩৬ শতাংশ জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করা হয়েছে। এ ছাড়াও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন নগরীর বিভিন্ন অংশে ৯ বছর আগে এক লাখ ৯৩৭ একর জলাশয় এবং নিম্নভূমি ছিল; কিন্তু এরই মধ্যে ২২ শতাংশ অর্থাৎ ২২ হাজার ১৫৬ একর ভরাট করা হয়েছে, যা প্রতিবছর জলাবদ্ধতা ইস্যুতে ব্যাপক অবদান রাখছে। ঢাকায় ১২ শতাংশ জলাধার থাকার কথা ছিল, যা এখন মাত্র তিন শতাংশ। সব পুকুর এবং জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়নও সমস্যা সৃষ্টি করেছে, কারণ ঢাকার মোট ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৩৩০ বর্গকিলোমিটার এরই মধ্যে ঘরবাড়ি, জলের প্রবাহের পথে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নদী-খাল ও জলাশয়ের অবৈধ দখল ও দূষণ ঢাকার পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দ্রুত নগরায়নের কারণে ঢাকার জলাশয় মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। পানি ও বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানি হ্রাস ও অন্যান্য সঙ্কট শহরটিকে প্রভাবিত করেছে। একই সাথে খালের পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের জন্য সিটি করপোরেশনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দরকার। জলাশয়ের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ দখল ও ভরাটে পরিবেশ বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলাশয় ভরাটের ফলে বৃষ্টির পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তারা আরো বলেন, নদী-খাল, জলাশয়-জলাভূমি দখলকারী কিংবা নগর এলাকায় বিপজ্জনক শিল্পকারখানার মাধ্যমে বায়ুদূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। শহরের যানজট-জলজট-শব্দদূষণ দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। এলাকার সমস্যা সমাধানে সরকার পাড়া-মহল্লার মানুষ কিংবা কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। বিশেষত, নগরে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক এলাকায় বসবাসরত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আরো বেড়েছে।

ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি জানায়, তাদের অনেক পরিকল্পনা থাকলেও খালের জন্য আলাদা কোনো টিম বা জনবল নেই। বর্তমানে চারটি খাল পরিষ্কারের কাজ চলমান রয়েছে। ডিএনসিসি খাল ও ড্রেনেজ রক্ষার্থে ১৭টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘নীল নেটওয়ার্ক’ প্রকল্পে প্রায় ১২ দশমিক পঁাঁচ কিলোমিটার খাল ও ১২ দশমিক তিন কিলোমিটার নদী উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। স্থায়ী জলাবদ্ধতা সমাধানে একটি সংশোধিত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, খাল, নদী, জলাশয় দখল ও দূষণকারীদের সরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিক আন্দোলনের ব্যাপারে সরকার ছিল নির্লিপ্ত। সিটি করপোরেশন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে, কিন্তু খাল রক্ষার্থে যথাযথ কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়নি। উন্নত বিশ্বে খাল রক্ষা করা হয়। আমাদের দেশের খালগুলো দখল-দূষণ-বাসাবাড়ির ময়লা ফেলার স্থান হয়ে গেছে। বিগত বছর অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনা, ইমারত নির্মাণ, নগরায়ন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা তৈরি করেছে; কিন্তু নগর এলাকায় নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। নগর এলাকায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপরায়ণতার ব্যাপারে সরকার ছিল উদাসীন।