বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন খাত থেকে
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গ্রাফ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটকের আগমন ও এ খাত থেকে আয় আশঙ্কাজনক হারে কমছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নিরাপত্তাহীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই দশকে বৈশ্বিক পর্যটন বাজার যে হারে বেড়েছে, বাংলাদেশ সেখানে তার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পর্যটন খাতের অবদান জিডিপিতে অত্যন্ত নগণ্য পর্যায়ে রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে পর্যটক আগমনের হার কমেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পর্যটন থেকে ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৪৪ কোটি ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ পর্যটকের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও মানসম্মত ও উচ্চবিত্ত পর্যটক না আসায় আয় কমেছে প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা (১.৩০ মিলিয়ন ডলার)।
সঙ্কটের মূল কারণগুলো
বিশেষজ্ঞ ও স্টেকহোল্ডারদের মতে, পর্যটন খাতের এই ধসের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করছে :
১. নিরাপত্তা ও অস্থিরতা : বিদেশী পর্যটকদের জন্য প্রথম শর্ত হলো নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং কিছু পর্যটন এলাকায় ছোটখাটো অপ্রীতিকর ঘটনা বিদেশীদের মনে আস্থার সঙ্কট তৈরি করেছে।
২. ভিসা জটিলতা ও আমলাতন্ত্র : এখনো অনেক দেশের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। ই-ভিসা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হওয়ায় অনেক পর্যটক প্রতিবেশী দেশ ভারত বা নেপাল বেছে নিচ্ছেন।
৩. অবকাঠামো ও সেবার মান : কক্সবাজার বা কুয়াকাটার মতো স্থানে আন্তর্জাতিক মানের সড়ক যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব প্রকট। এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্চমূল্য কিন্তু নিম্নমানের সেবা পর্যটকদের হতাশ করছে।
৪. প্রচারণার অভাব : ডিজিটাল যুগে বৈশ্বিক গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলোর ব্র্যান্ডিং নেই বললেই চলে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী জানান : “বিদেশী পর্যটকরা এখন অনেক সচেতন। তারা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে আসে না, তারা চায় স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা। আমাদের এখানে ভিসা প্রক্রিয়া এখনো প্রাগৈতিহাসিক। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্থাপনায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং পরিবেশ দূষণ পর্যটকদের নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।’
অন্য দিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে আগত পর্যটকদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই প্রবাসী বাংলাদেশী (ঘজই)। প্রকৃত বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ এখনো আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে ওঠেনি।
সম্ভাবনা ও লক্ষ্যমাত্রা
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ২০৪১ সালের মধ্যে বার্ষিক ৫৫ লাখ পর্যটক আনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু পরিকল্পনা দিয়ে পর্যটক আসবে না। এজন্য প্রয়োজন :
১. এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন নির্মাণ যেখানে বিদেশীরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুযায়ী বিচরণ করতে পারবে।
২. ভিসা সহজীকরণ এবং স্টুয়ার্ডশিপ সেবা নিশ্চিত করা।
৩. পর্যটন পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিটি স্পটে আন্তর্জাতিক মানের গাইড নিয়োগ।
দক্ষিণ এশিয়ায় পর্যটন যখন বিলিয়ন ডলারের শিল্প, তখন বাংলাদেশ বছরে মাত্র ১৬০ কোটি টাকার কাছাকাছি আয় হারাচ্ছে শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে। দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে এই খাতটি দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।



