নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নির্বাচন বানচালে বিভিন্ন মাধ্যমে নাশকতা, সহিংসতা, সাইবার হামলাসহ বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে খোদ গোয়েন্দা সূত্র থেকে। তবে যে কোনো অপ্রীতিকর এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মাঠে নেমেছেন।

এস এম মিন্টু
Printed Edition
  • সন্দেহভাজন ভোটারদের দূর থেকেই গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে গোয়েন্দারা
  • বডি-ওর্ন ক্যামেরায় সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবে অপারেশনস কমান্ড ও কন্ট্রোল রুম
  • মাঠে সরব সেনাবাহিনী, পুলিশ-বিজিবি, র‌্যাব ও আনসার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র এক দিন। গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিরাপত্তার সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নির্বাচন বানচালে বিভিন্ন মাধ্যমে নাশকতা, সহিংসতা, সাইবার হামলাসহ বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে খোদ গোয়েন্দা সূত্র থেকে। তবে যে কোনো অপ্রীতিকর এবং অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মাঠে নেমেছেন।

দাগি ও চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, উগ্রবাদ ও নাশকতাকারী, অস্ত্রধারী, বোমা তৈরির কারিগরসহ নাশকতায় যুক্ত অপরাধীদের ধরতে গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি বৃদ্ধি, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পর্যাপ্ত পরিমাণ ড্রোন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়াও ভোটকেন্দ্রে এবং কেন্দ্রের বাইরে সন্দেহভাজন ভোটার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারদেরও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে জেলা সার্বক্ষণিক মনিটরিং অপারেশনস কমান্ড ও কন্ট্রোল রুম।

ভোটের দিন বাসা থেকে কেন্দ্রের বাইরে এবং ভেতরে স্ব স্ব স্থান থেকে যেন ভোটাররা নির্বিঘেœ বাসায় পৌঁছাতে পারে সেজন্য সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশের ও র‌্যাবের টহলটিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। ভোটারদের নিরাপত্তায় স্থলভাগে থাকছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলীয় এলাকায় ভোটারদের নিরাপত্তায় থাকছে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জাহাজ। যেকোনো নাশকতা এড়াতে আকাশ পথে প্রস্তুত রয়েছে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ও অত্যাধুনিক ড্রোনসহ অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। এ ছাড়াও সীমান্তে অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরায় মনিটরিং করবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ভোট চলাকালে সীমান্তের ওপারে ভারত ও মিয়ানমার থেকে কোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড, ভোটারদের যেন প্রভাববিস্তার ও বিভ্রান্ত না করতে পারে সেজন্য বিজিবি বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

সেনাবাহিনীর কার্যক্রম : সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেছেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের আগেই কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। গত ১০ জানুয়ারি আমাদের যে মোতায়েন সংখ্যা ছিল সেটা ৩৫ হাজার সেখান থেকে বাড়িয়ে আমরা ৫০ হাজারে উন্নীত করেছি। পরবর্তীতে ২০ জানুয়ারি থেকে এক লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সারা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি জেলায় ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল যৌথ অভিযান এবং আমরা চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপরাধী গ্রেফতার কার্যক্রম চলমান রেখেছি। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে পূর্ব নির্বাচনগুলোর চেয়ে অনেক বেশি টেকনোলজি ব্যবহার বা প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, সুরক্ষা অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের কাছে বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকছে। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ড্রোন এবং অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার করবে যাতে দ্রুততম সময়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব হয়।

বিমানবাহিনীর কার্যক্রম : এবারের নির্বাচনে প্রথমবার বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং দ্রুত পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনী হেলিকপ্টার ও ড্রোন প্রস্তুত রেখেছে। বিশেষ করে ভোলাসহ উপকূলীয় ও দুর্গম চরাঞ্চলে নৌবাহিনীর সাথে যৌথভাবে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে নির্বাচনী সরঞ্জাম পরিবহন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দ্রুত রেসপন্স করার জন্য বিমানবাহিনী স্ট্যান্ডবাই থাকবে।

বিজিবির নিরাপত্তা : নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) শতভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এরই মধ্যে দেশের প্রায় প্রত্যেকটি নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন বিজিবি মহাপরিচালক। নির্বাচনে বিজিবি সারা দেশে এক হাজার ২১০ প্লাটুন এবং ৩৫ হাজার থেকে ৩৭ হাজারের বেশি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতে দায়িত্ব পালন করছেন। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তসহ সব সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ওই সব এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি হেলিকপ্টার, ড্রোন, বডি ওর্ন ক্যামেরা এবং ডগ স্কোয়াড (ক-নাইন) ব্যবহার করছে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কুইক রেসপন্স ফোর্স (কিউআরএফ) এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম (র‌্যাট) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় হেলিকপ্টার সহায়তায় বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি ও ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

উপকূলীয় ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা : উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চল যেমন ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, কক্সবাজার এবং সেন্টমার্টিনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর ও কোস্টগার্ডের জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে নৌবাহিনী পাঁচ হাজার ও কোস্টগার্ডের তিন হাজার সদস্য নিরাপত্তায় কাজ করবে।

বিমানবন্দর ও রেলপথে নিরাপত্তা : সারা দেশের বিমানবন্দরগুলোতে নাশকতা রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারির পাশাপাশি রেলপথে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ডিএমপির প্রস্তুতি : গতকাল ডিএমপির কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী বলেছেন, নির্বাচনে এ বছর ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় মোট দুই হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। অবস্থান, ভোটারের সংখ্যা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভোটকেন্দ্রগুলোকে দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ (১৬১৪টি) ভোটকেন্দ্রে ন্যূনতম চারজন করে এবং সাধারণ (৫১৭টি) কেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি কন্ট্রোলরুমের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তার জন্য থাকবে ১৮০টি স্ট্রাইকিং টিম ও ৫১০টি মোবাইল টিম। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীর আটটি ডিভিশনে আটটি পৃথক কন্ট্রোল রুম এবং চারটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন থাকবে স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্স। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি নেতৃত্বে থাকা এসব ফোর্স প্রয়োজনে দ্রুত যেকোনো স্থানে মোতায়েন করা যাবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড, ক্রাইমসিন ভ্যান ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন থাকবে।

তিনি আরো বলেন, নানা কারণে এবারের নির্বাচন আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে নির্বাচনে পুলিশকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সে কালিমামুক্ত হয়ে জাতিকে একটি অর্থবহ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যে ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে দেশ একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে তা এগিয়ে নিতে আমরা ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে প্রস্তুত রয়েছি। আপনাদের মাধ্যমে সর্বসাধারণের কাছে স্পষ্টভাবে বলতে চাই এই নির্বাচনে আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও প্রশ্নাতীত নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে এমন একটি মানদণ্ড স্থাপন করব যা ভবিষ্যতের জন্য অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

সম্মানিত নগরবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আপনারা নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে ও নির্বিঘেœ ভোটকেন্দ্রে সুশৃঙ্খলভাবে গিয়ে আপনাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করুন।