ইরান-ইসরাইল-মার্কিন যুদ্ধে ভারতের ৫০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স ঝুঁকি

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধে ভারতে তেল-গ্যাসের তীব্র ঘাটতি ছাড়াও উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী ৯০ লাখ ভারতীয় প্রবাসী অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত তার জ্বালানির চাহিদা মেটাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী বিশাল কর্মী বাহিনীর পাঠানো রেমিট্যান্সের জন্যও উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।

জ্বালানির ঘাটতি

ভারতের ৮০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস এবং ৬০ শতাংশ পর্যন্ত তেল হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। ইরান কার্যকরভাবে প্রণালীটি বন্ধ করে দেয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারীদের তেল এবং এলএনজি সরবরাহের জন্য কোনো সমুদ্রপথ অবশিষ্ট নেই। বেশির ভাগ জাহাজ বীমাকারী সংস্থা প্রণালীতে থাকা ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য যুদ্ধ ঝুঁকি বীমা বাতিল করেছে। এমনকি ভারতগামী একটি থাই জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার পর ভারতে আরো উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ভারতে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো ইতোমধ্যেই বন্ধ করে দেয়ার কথা ভাবছে এবং ঘাটতির আশঙ্কায় মানুষ এলপিজি (রান্নার গ্যাস) সিলিন্ডার মজুদ করার জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছে, যদিও সরকার জনগণকে আশ্বাস দিয়েছে যে তাদের কাছে প্রায় এক মাসের মজুদ রয়েছে। তবে আতঙ্ক এতটাই যে, সরকার মজুদদারি নিরুৎসাহিত করতে জরুরি ব্যবস্থা পর্যন্ত নিয়েছে এবং জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

ভারত কি ৯০ লাখ নাগরিককে সরিয়ে নিতে পারবে?

যদি যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে ভারতকে তার জনগণকে সরিয়ে নেয়ার বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, যারা বেশির ভাগ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বৃহত্তম প্রবাসী সম্প্রদায় হিসেবে কাজ করছে। হাজার হাজার পশ্চিমা প্রবাসী ইতোমধ্যেই তাদের দেশ ছেড়েছেন বা তাদের দেশ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, কিন্তু বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিক সেখানে থাকায় এটিকে একটি লজিস্টিক দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি প্রবাসী বাস করেন। তাদের মধ্যে ৯১ লাখ ভারতীয় এবং এর পরেই আছে ৪৯ লাখ পাকিস্তানি।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত আহমেদ বলেছেন যে, ‘যুদ্ধের পরিস্থিতিতে, ভারতসহ কোনো দেশের পক্ষেই দশ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা ভালো সময়ে আমাদের উপসাগরীয় ভাইদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিলাম; খারাপ সময়েও তাদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকব।’

তবে, আহমদ উল্লেখ করেছেন যে, ভারত অতীতের বিভিন্ন সঙ্ঘাতে, যার মধ্যে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধও অন্তর্ভুক্ত, সফলভাবে নাগরিকদের সরিয়ে এনেছে। সেই সময় তিনি জেদ্দায় ভারতের কনসাল জেনারেল ছিলেন। ১৯৯০ সালে ইরাক উপসাগরীয় দেশটিতে আক্রমণ করলে কুয়েত থেকে প্রায় দুই লাখ ভারতীয় নাগরিককে সরিয়ে আনা হয়েছিল।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং এ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে, অন্য দিকে দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো প্রয়োজনে ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তা করার জন্য দিনরাত হেল্পলাইন চালু করেছে। ভারতীয় দূতাবাসগুলোও বাণিজ্যিক ও অনির্ধারিত ফ্লাইটের মাধ্যমে আটকে পড়া ভারতীয় যাত্রীদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেছে।

ভারতের স্বার্থ কী?

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পান্ত বলেছেন যে, যুদ্ধের পরিণতি যাই হোক না কেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে থাকবে, যদিও সঙ্ঘাত বাড়লে বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হতে পারে। রাশিয়ার তেল অবশ্যই একটি বিকল্প হবে। জ্বালানি প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও আলোচনা হয়েছে। ভারত গত দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনে আসছে এবং এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও বেড়েছে।’

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সরকারের নীরবতার সমালোচনা করেছে। খামেনির হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারত কোনো বিবৃতি দেয়নি, যদিও দেশটির পররাষ্ট্র সচিব শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন।

এ দিকে, নয়াদিল্লি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়েছে, যে দেশগুলোর সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী সংবাদপত্রের এক কলামে লিখেছেন, ‘যখন কোনো বিদেশী নেতাকে লক্ষ্য করে চালানো হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের দেশ সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিক আইনের কোনো স্পষ্ট যুক্তি দেয় না এবং নিরপেক্ষতা বিসর্জন দেয়া হয়, তখন তা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়।’

এ ছাড়া ভারতের আয়োজিত সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়ে দেশে ফেরার পথে একটি মার্কিন সাবমেরিনের হামলায় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানানোয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারও সমালোচনার মুখে পড়েছে। জাহাজটি শ্রীলঙ্কার উপকূলে থাকাকালীন টর্নেডোর আঘাতে ডুবে যায়। পরবর্তীতে ভারত দ্বিতীয় একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজকে আশ্রয় দিয়েছে, যেটি তাদের আয়োজিত মহড়ায় যোগ দিয়েছিল।

তবুও, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইল হামলার কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর ইসরাইল সফরের সময় নিয়েও বিরোধী দল এবং মোদির সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন। ভারত ইসরাইলি অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদির ইসরাইল সফর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে বৈধতা দিয়েছে, যিনি গাজায় যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানার মুখোমুখি।

‘ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড দ্য ইয়ার্স দ্যাট ট্রান্সফর্মড ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের লেখক শ্রীনাথ রাঘবন ইন্ডিয়া ফোরাম ওয়েবসাইটের একটি কলামে লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ইসরাইলি নেতা নেতানিয়াহু জানেন যে তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ধারাবাহিকতা এবং বিদেশী নেতাদের কাছ থেকে বৈধতার স্বীকৃতি। এ ক্ষেত্রে, ট্রাম্প প্রথমটি দিয়েছেন, আর মোদি দ্বিতীয়টি দিয়ে সহায়তা করেছেন।’

তবে, পান্ত ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি সমর্থন করে আলজাজিরাকে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আরব রাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ভারতের স্বার্থ এতটাই বেড়েছে যে ভারত-ইরান সম্পর্ক সেই মাত্রার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, ভারত বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, ইরানের চেয়ে আরব বিশ্ব এবং ইসরাইলের সাথে সম্পর্কই ভারতের স্বার্থকে বেশি প্রভাবিত করেছে।’