ইমদাদুল হক পাইকগাছা (খুলনা)
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে এ অঞ্চলে মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হচ্ছে।
উপকূলের বাসিন্দারা জানান, সিডর, আইলা, আম্পান, সিত্রাং, মোখা ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে অনেক এলাকায় কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন কমে গেছে এবং বহু পরিবার জীবিকা সঙ্কটে পড়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যসম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
পাইকগাছার সোলাদানা ইউনিয়নের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, লবণাক্ত পানির কারণে ত্বকের রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাদের প্রধান চাহিদা ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ এবং নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুপেয় পানির সঙ্কটও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। অনেক এলাকায় নারীদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, লবণাক্ত পানির ব্যবহার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটের কারণে নারী ও শিশুদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং অপুষ্টির মতো সমস্যাও নিয়মিত দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, উপকূলের মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে। কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ও শিবসা নদীর ভাঙন রোধ, বিজ্ঞানভিত্তিক টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে।
তাদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে বাঁধ সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেয়নি। ফলে দুর্যোগের সময় একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং জীবিকাভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
উপকূলবাসীর প্রত্যাশা, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এই জনপদের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে আরো বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পান।



