বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কটেও স্বস্তিতে বাংলাদেশ

মজুদ সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ

দেশে এখন প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন ডিজেল মজুদ রয়েছে। চলতি মার্চ মাসের মধ্যেই আরো ৭৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শুধু ডিজেলই নয়, অন্যান্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও চিত্র আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে দেশে ২৬ হাজার মেট্রিক টন অকটেন মজুদ রয়েছে। পেট্রল ও ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত মজুদ বজায় রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

রাশিয়া-ইউক্রেন সঙ্ঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নতুন করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যেই জ্বালানি তেলের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়েছে। তবে এমন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের সঙ্কটের আশঙ্কা নেই বরং পর্যাপ্ত মজুদ, বাড়তি সরবরাহ এবং বিকল্প আমদানি উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এপ্রিল মাস পর্যন্ত স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখন প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন ডিজেল মজুদ রয়েছে। চলতি মার্চ মাসের মধ্যেই আরো ৭৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শুধু ডিজেলই নয়, অন্যান্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও চিত্র আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে দেশে ২৬ হাজার মেট্রিক টন অকটেন মজুদ রয়েছে। পেট্রল ও ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত মজুদ বজায় রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সরবরাহ বেড়েছে, তবুও কেন চাপ?

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের মার্চ মাসে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার ৭৭৭ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করা হতো, সেখানে চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫৭৫ মেট্রিক টন, অর্থাৎ দৈনিক ৭৯৮ মেট্রিক টন বেশি সরবরাহ। অকটেনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বছর মার্চে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৩ মেট্রিক টন অকটেন সরবরাহ করা হলেও, এবার তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪১৮ মেট্রিক টন। প্রতিদিন ২২৫ মেট্রিক টন বেশি। পেট্রলের সরবরাহ সামান্য ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে জ্বালানি সরবরাহের প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। তবে প্রশ্ন উঠছে, যদি সরবরাহ বাড়ে, তাহলে পাম্পে সঙ্কটের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে কেন?

আতঙ্ক ও অতিরিক্ত মজুদ, সঙ্কটের মূল কারণ : জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাস্তবে জ্বালানি ঘাটতি নেই; বরং মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া আতঙ্কই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে অনেকেই ভবিষ্যৎ সঙ্কটের আশঙ্কায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি কিনছেন। এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও জ্বালানি তেল মজুদ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে দিনের প্রথমভাগে স্বাভাবিক সরবরাহ থাকলেও, দুপুরের পর অনেক পাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, যা একটি ‘চক্রাকার সঙ্কট’ তৈরি করছে।

সরকারের আশ্বাস : ‘সঙ্কট নয়, এটি আচরণগত সমস্যা’

ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে প্রথম কর্মদিবসে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু স্পষ্টভাবে বলেন, দেশে কোনো জ্বালানি সঙ্কট নেই। তার ভাষায়,

“দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে শুরু করায় পাম্পগুলোতে সময়ের আগেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে।” তিনি দেশবাসীর প্রতি সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করলেই সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। সবাই প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাবেন, শঙ্কার কোনো কারণ নেই।” মন্ত্রী আরো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি কেনার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। তিনি এটিকে ‘বাস্তব সঙ্কট নয়, বরং আচরণগত সঙ্কট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ঈদযাত্রা, বাস্তবতার বড় প্রমাণ : মন্ত্রী উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক ঈদযাত্রার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঈদের সময় লাখো মানুষ বাড়ি ফিরেছেন, কিন্তু কোথাও জ্বালানির অভাবে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়নি। এটি প্রমাণ করে যে, দেশে প্রকৃতপক্ষে জ্বালানির ঘাটতি নেই, বরং আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয়ই সাময়িক চাপ সৃষ্টি করছে।

পাইপলাইনে পর্যাপ্ত জ্বালানি, নতুন চালান আসছে : সরকারি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের পাইপলাইনেও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল রয়েছে। চলতি মাসেই ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী মাসের শুরুতেই সিঙ্গাপুর থেকে আরো এক লাখ টন ডিজেল দেশে পৌঁছাবে। এ ছাড়া এলএনজি মজুদও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিকল্প আমদানির পথে বাংলাদেশ : বিশ্ববাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প বাজার খুঁজছে। ইতোমধ্যে ডিজেল আমদানির জন্য উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র, কাজাখস্তান ও নাইজেরিয়াকে সম্ভাব্য বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বহুমুখী আমদানি কৌশল দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ : বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা প্রায় এক মাসের সমান। তবে সরকার এটিকে ৬০ থেকে ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ লক্ষ্যে নতুন স্টোরেজ সুবিধা নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামো, যেমন রেলওয়ের ওয়াগন ও ডিপো ব্যবহারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবেলা করা আরো সহজ হবে।

সতর্কতা ও সচেতনতার আহ্বান : বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। যদি মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না কেনে, তাহলে বাজারে কোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হবে না। সরকারও একই বার্তা দিচ্ছে, সঙ্কট নয় বরং দায়িত্বশীল আচরণই পারে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক রাখতে। বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ, বাড়তি সরবরাহ, চলমান আমদানি এবং বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাত এখন প্রস্তুতির এক ইতিবাচক উদাহরণ। তবে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন জনগণের সহযোগিতা। অযথা আতঙ্ক নয়, সচেতন ব্যবহারই পারে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে। বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি তাই সঙ্কটের গল্প নয়, বরং এটি এক সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক অনুসন্ধানী চিত্র।