সমুদ্রের গর্জন
সারা বাংলা যখন পৌষের হাড়হিম করা শীতে আড়ষ্ট, ভ্রমণপিপাসু হৃদয়ে তখন উষ্ণতার জোয়ার। শীতকাল মানেই ভবঘুরে মনের ডানামেলার সময়। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথে ক্লান্তিহীন হেঁটে চলা কিংবা কুয়াশাভেদি ভোরে অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত ঋতু আর নেই। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কক্সবাজারের পেকুয়ায়, সমুদ্র ও পাহাড়ের এক অদ্ভুত মিতালির মধ্যে। সমুদ্রের নোনা বাতাসের সন্তান হয়েও পাহাড়ের বিশালতা আমাকে চুম্বকের মতো টানে। মনে হয়, পাহাড় যেন তার সবুজ বাহু প্রসারিত করে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে চায়, আর আমিও সেই আলিঙ্গন উপেক্ষা করতে পারি না।
শীতের ছুটিতে বাড়িতে অলস সময় না কাটিয়ে মনস্থির করলাম, এবার পাহাড় দেখব। বন্ধু আসিফের পরিকল্পনায় সঙ্গী হলো এরশাদ ও আরিফ। তিনজনই আমার এক ব্যাচ সিনিয়র, তবে বন্ধুত্বের টানে আমরা অবিচ্ছেদ্য। গন্তব্য মিরিঞ্জা ভ্যালি। মনের গোপন কোণে ইচ্ছে ছিল মারায়াতং, লামা ও আলিকদমও ছুঁয়ে দেখব। বান্দরবানের রুমা উপজেলায় অবস্থিত মিরিঞ্জা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার ফুট উচ্চতায়। মারমা ও ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস এ অঞ্চলে। পাহাড়ের বুকে লুকিয়ে থাকা এই স্বর্গখণ্ড দেখার জন্য আমার মন বহুদিন ধরেই ছটফট করছিল।
দিনটি ছিল ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫। ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি মিলিয়ে যেতেই প্রস্তুতির পালা শেষ। কুয়াশার চাদর মুড়ি দেয়া ভোরে পেকুয়ার শিলখালী, পেঠান মাতবর পাড়া থেকে চার বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম। ব্যাগে ছিল জরুরি কাপড়, কাগজপত্র, হালকা খাবার এবং একটি পুরনো ক্যামেরা; যা দিয়ে ধরে রাখব স্মৃতির প্রতিটি মুহূর্ত। রাস্তায় নামতেই দেখা মিলল এলাকার বড়ভাই হেলালের সাথে। কাকতালীয়ভাবে তিনি তার সিএনজি নিয়ে বের হয়েছিলেন। ‘কই যাস এত সকালে?’ জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ‘মিরিঞ্জা, ভাই। পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিতে যাচ্ছি’ উত্তর দিলাম। ঘরের ছেলে ঘরের গাড়িতে, এর চেয়ে স্বস্তির আর কী হতে পারে! পথে আরেকজন যাত্রী সঙ্গী হলেন, তাতে আমাদের আপত্তি ছিল না; বরং এলাকার ভাইয়ের উপার্জনে খুশিই হলাম। পেকুয়া রাস্তার মাথায় নেমে অন্য সিএনজিতে চকরিয়া বাস টার্মিনাল। ভোরের আলো তখন আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে চার পাশে। চকরিয়া বাসটার্মিনাল নামলাম সকাল সাড়ে ৭টায়। ধোঁয়া ওঠা পরোটা, ডিম আর গরম চা দিয়ে নাশতা সারলাম। শীতের সকালে এর চেয়ে স্বাদের আর কিছু নেই। সেখান থেকে মিরিঞ্জা যাওয়ার চান্দের গাড়ির (জিপ) টিকিট কাটলাম, জনপ্রতি ৮০ টাকা। বাসে ৭০ টাকা ভাড়া। ছাদ খোলা গাড়িতেও যাওয়া যায়। পাহাড়ি পথে নিরাপত্তার খাতিরে আইডি কার্ডের ফটোকপি জমা দিতে হয়, তাই চারজনই দুই কপি করে ফটোকপি নিয়েছিলাম। চেকপোস্টে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভদ্রভাবে আমাদের তথ্য নিলেন এবং নিরাপদ ভ্রমণের পরামর্শ দিলেন।
চান্দের গাড়ি চলতে শুরু করল আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল সবুজ পাহাড়, বাঁশঝাড়, কলাবাগান, রাবার বাগান ও মাঝে মধ্যে পাহাড়ি ঝিরির ঝিলমিল জল। প্রায় আধা ঘণ্টার যাত্রায় দুর্ঘটনা ঘটল, গাড়ি বিকল হয়ে গেল। ড্রাইভার জানালেন ইঞ্জিনের সমস্যা, পরবর্তী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রায় আধা ঘণ্টার অপেক্ষা। কিন্তু ভ্রমণের নেশায় এইটুকু কষ্ট তুচ্ছ; বরং এই অপ্রত্যাশিত বিরতি আমাদের উপহার দিলো প্রকৃতিকে আরো কাছ থেকে দেখার সুযোগ। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম দূরের পাহাড়ে মেঘের খেলা, শুনলাম নাম না জানা পাখির ডাক, অনুভব করলাম পাহাড়ি বাতাসের শীতল স্পর্শ। নতুন গাড়িতে চেপে যখন মিরিঞ্জা পৌঁছালাম, তখন প্রায় সাড়ে ১০টা বাজে। গাড়ি থেকে নেমেই মিরিঞ্জা ভ্যালির পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথে হাঁটা শুরু করলাম। শুরু হলো পাহাড়ি ঢাল বেয়ে হাঁটা। ট্রেকিং পথের শুরুতেই একটি ছোট দোকানে দাঁড়ালাম। দোকানদার, একজন মারমা যুবক, জানালেন চূড়া পর্যন্ত যেতে প্রায় ৩৫ মিনিট থেকে ৫০ মিনিট লাগবে। ‘ধীরে ধীরে যাইয়েন, তাড়াহুড়া করলে ক্লান্ত হয়ে যাবেন’ তিনি পরামর্শ দিলেন। পথের দুপাশে গভীর ঝিরি, হঠাৎ বৃষ্টির স্বচ্ছ জলে সূর্যের আলোর প্রতিফলন। নাম না জানা বুনো ফুলের গন্ধে ভরপুর বাতাস। কলা ও ফলের বাগানের সজীবতা চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। মাঝেমধ্যে দেখা যাচ্ছিল ছোট ছোট ঝরনা, যেগুলো পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে। পথে পথে রংবেরঙের কটেজ কোনোটা লাল, কোনোটা নীল, কোনোটা হলুদ। প্রতিটি কটেজ যেন রংধনুর একেকটি রঙ ধরে রেখেছে। কিছু কটেজের সামনে বসে পর্যটকরা চা-কফি খাচ্ছিল, কেউ কেউ ছবি তুলছিল। প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটার পর যখন একটা উঁচু ভিউপয়েন্টে পৌঁছালাম, চোখের সামনে ভেসে উঠল এক মায়াবী দৃশ্য। পুরো মিরিঞ্জা উপত্যকা যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। সবুজ পাহাড়ের ঢেউ, তার ভাঁজে ভাঁজে মেঘের ওড়াউড়ি, দূরে নীল আকাশের বিস্তৃতি মনে হলো এ যেন মর্ত্যরে বুকে একটুকরো স্বর্গরাজ্য। ‘এই দৃশ্য দেখার জন্যই বারবার পাহাড়ে আসতে ইচ্ছে করে’ বলল আসিফ, তার কণ্ঠে বিস্ময়। আরিফ মোবাইল বের করে ছবি তুলতে শুরু করল। কিন্তু আমরা জানি, ক্যামেরা এই সৌন্দর্যের শতকরা এক ভাগও ধরতে পারবে না। এটি শুধু চোখে দেখার এবং হৃদয়ে অনুভব করার। সেখানে একটি পাথরের ওপর বসে আমরা নীরবে প্রকৃতি উপভোগ করলাম। এরশাদ বলল, ‘জানিস, শহরের যান্ত্রিক জীবনে আমরা ভুলেই গেছি প্রকৃতি কত সুন্দর। এখানে এসে মনে হয় জীবন আসলে অনেক সহজ।’ সত্যিই তাই। পাহাড়ের এই নিস্তব্ধতায় জীবনের জটিলতা যেন মুছে যায়, থাকে শুধু মুহূর্ত আর শান্তি। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটিয়ে ছবি তোলা আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতা উপভোগ করতে করতেই ঘড়ির কাঁটা জানান দিলো, লামা, মারায়াতং ও আলিকদম যাওয়ার সময় আর নেই। একটু আফসোস হলো, তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম পরের বার এই জায়গাগুলো অবশ্যই দেখব।
পাহাড়ের মায়া কাটিয়ে মনের গহিনে বেজে উঠল সমুদ্রের গর্জন। হঠাৎ মনে পড়ল, আমি তো সমুদ্রের ছেলে। কতদিন সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে খেলিনি!
‘চলো কক্সবাজার যাই’ প্রস্তাব দিলাম আমি।
‘সমুদ্র দেখে আসি’ আসিফ রাজি হলো।
প্ল্যান বদলে সোজা চকরিয়া ফিরে দুপুরের খাবার খেলাম। শিমের বীচি দিয়ে চিংড়ি মাছের ঝোল, ডাল ও শাক দিয়ে ভাত সাধারণ খাবার কিন্তু ভ্রমণের ক্লান্তিতে স্বাদ ছিল অসাধারণ। একটু বিশ্রাম নিয়ে বাস ধরলাম কক্সবাজারের উদ্দেশে। বাসে বসে দেখছিলাম পথের দুই পাশের দৃশ্য। ধানক্ষেত, গ্রামের মানুষের সহজ জীবন, ছোট ছোট হাট-বাজার। এক বুড়ো মানুষ রাস্তার পাশে বাঁশের চেয়ারে বসে তামাক খাচ্ছিল, তার মুখে তৃপ্তির হাসি। মনে হলো-সুখ আসলে কত সহজ। আসরের সময় কক্সবাজার পৌঁছলাম। প্রথমে গেলাম নতুন করে তৈরি হওয়া কক্সবাজার রেলস্টেশন। আধুনিক স্থাপত্যের এই স্টেশন দেখতে বেশ সুন্দর। সেখানে ঘুরে, ছবি তুলে ফিরতে ফিরতে মাগরিবের সময় হয়ে গেল। একটা দোকানে বসে চা-নাশতা খেলাম। কক্সবাজারের বিখ্যাত শুঁটকির চপ আর শিঙ্গাড়া খেতে খেতে আড্ডা দিলাম। তারপর গেলাম কক্সবাজার বাণিজ্যমেলায়। সেখানে নানা ধরনের স্টল, পর্যটকদের ভিড়, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ব্যস্ততা একটি উৎসবমুখর পরিবেশ। বাণিজ্যমেলা থেকে বেরিয়ে গেলাম এক বন্ধুর কাছে যে কক্স কার্নিভাল রেস্টুরেন্টে কাজ করে। আসিফদের এক ব্যাচমেট, নাম তার সাকিব। সেখানে বসে আড্ডা দিলাম প্রায় দেড় ঘণ্টা। সাকিব জানাল কক্সবাজারে পর্যটকদের আনাগোনা, সমুদ্রের বিভিন্ন গল্প।
মাঝরাতে আমরা খেতে গেলাম একটি রেস্টুরেন্টে। গরম খিচুড়ি আর মুরগির ভুনা। শীতের রাতে এর চেয়ে ভালো খাবার আর কী হতে পারে? খাওয়ার পর আবার ফিরে এলাম সৈকতে। এবার সিট ভাড়া নিলাম বিশ্রামের জন্য প্রতি সিট এক ঘণ্টা ৩০ টাকা । সারাদিন পাহাড়ে হাঁটা, তারপর সমুদ্রসৈকতে ঘোরাঘুরি শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মন চাইছিল না ঘুমাতে। সূর্যোদয় দেখব, সেই প্রতিজ্ঞা করে রেখেছি। সৈকতে বসে থাকার মজাই আলাদা। মাঝে মাঝে চায়ের দোকানদার আসছে, কেউ সিগারেট বিক্রি করছে, কেউ গরম কফি নিয়ে ঘুরছে। রাত সাড়ে ৩টার দিকে আবার চা খেলাম। সেই শীতের রাতে সমুদ্রের পাশে বসে গরম চা খাওয়ার অনুভূতি অসাধারণ। কিন্তু পাশাপাশি দেখছিলাম মানুষের অধঃপতন। রাত যত বাড়ছিল, যৌবনের তাড়নায় অবৈধ কার্যকলাপও বাড়ছিল। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণ থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী অনেকেই এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। জাহেলি যুগের মতো এই ঘৃণ্য সংস্কৃতি দেখে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।
সারা রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি আর মনের ভেতর জমে থাকা বিষাদ নিয়ে অপেক্ষা করলাম সূর্যোদয়ের। ফজরের আজান শুনে আমরা চারজন নামাজ পড়লাম সুগন্ধা সমুদ্রসৈকতের পাশের মসজিদে। সেই শীতল ভোরে, সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার অনুভূতি অন্য রকম। মনে হলো, আল্লাহর কাছে মানুষের জন্য হেদায়েত চাওয়া উচিত।
ফজরের পর পুব আকাশে যখন রক্তিম আভা দেখা দিলো, সমুদ্রের জল সেই আলোয় চিকচিক করে উঠল। প্রথমে একটি লাল আভা, তারপর আস্তে আস্তে পুরো সূর্যবিম্ব। সমুদ্রের জলে সূর্যের আলোর প্রতিফলন যেন সোনার নদী বয়ে যাচ্ছে। সূর্যের সেই পবিত্র উষ্ণ ছোঁয়ায় আকাশ রাঙিয়ে, সমুদ্র রাঙিয়ে, আমাদের মনও রাঙিয়ে উঠল। মনের গ্লানি মুছে ফেলার প্রার্থনা করলাম। প্রার্থনা করলাম যুবসমাজ যেন সঠিক পথ খুঁজে পায়। আমরা ছবি তুললাম। কিন্তু জানি, ক্যামেরা এই সৌন্দর্য ধরতে পারবে না। এ শুধু চোখে দেখার এবং মনে রাখার। এই সূর্যোদয় যেন জীবনের প্রতীক। যত অন্ধকারই থাকুক, একসময় আলো আসবেই। সত্যিই তাই। আমরা মানুষ। ভুল করতে পারি, পথভ্রষ্ট হতে পারি। কিন্তু তওবা করে ফিরে আসার সুযোগও আছে। সূর্য প্রতিদিন নতুন করে ওঠে, আমরাও পারি নতুন করে শুরু করতে।
ফেরার পথ ও জীবনদর্শন বাড়ির পথে যখন রওনা হলাম, তখন আমি এক পরিচিত অথচ অচেনা জগতের যাত্রী। সূর্যের আলোয় সৈকত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, পর্যটকদের নতুন দল আসতে শুরু করেছে। জীবন চলছে তার নিজস্ব গতিতে।



