বিএনপি-জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠে নতুন চেহারা

গাজীপুর-৫ আসনে নির্বাচনী হাওয়া

কাজী মোহাম্মদ ওমর ফারুক, কালীগঞ্জ (গাজীপুর)
Printed Edition

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রায় ১৭ বছর পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ) আসনের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ ও রাজনৈতিক উত্তাপ। এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।

গাজীপুর-৫ আসনটি গঠিত হয়েছে কালীগঞ্জ উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পূবাইল ইউনিয়নের ৪০, ৪১ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড এবং গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়ন নিয়ে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৫৪ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলায় ভোটার দুই লাখ ৫৯ হাজার ৩৪২ জন এবং পূবাইল ও বাড়িয়া ইউনিয়নে ভোটার ৯৫ হাজার ৩০১ জন। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো: আশরাফুল ইসলাম জানান, কালীগঞ্জ উপজেলায় মোট ভোটকেন্দ্র ৯০টি এবং ভোটকক্ষ ৪৭৯টি। পুরুষ ভোটার ৫০.৬৪ শতাংশ, নারী ভোটার ৪৯.৩৫ শতাংশ এবং ট্রান্সজেন্ডার ভোটার রয়েছেন ২ জন।

মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও গাজীপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ কে এম ফজলুল হক মিলন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও গাজীপুর মহানগরের নায়েবে আমির মো: খায়রুল হাসানসহ ছয়জন প্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন। বাকি দুই প্রার্থী- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের প্রার্থী রহুল আমীন কাসেমী এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো: সফিউদ্দিন সরকারের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর থেকেই বিএনপির একক কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত এ কে এম ফজলুল হক মিলন এলাকায় সক্রিয় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউনিয়নভিত্তিক সভা, মতবিনিময় ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রচারণা বন্ধ থাকলেও মাঠপর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন কৌশলে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। অহিংস কর্মসূচি, সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণ ভোটারসহ সাধারণ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করছেন জামায়াতের প্রার্থী মো: খায়রুল হাসান। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই কালীগঞ্জের রাজনীতিতে জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলটি নতুন করে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

২০২৪ সালের পাতানো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে (নৌকা) প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন মেহের আফরোজ চুমকী এবং স্বতন্ত্র (ট্রাক) প্রতীকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আখতারউজ্জামান। তারা উভয়েই ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সংসদ সদস্য হওয়ায় বর্তমানে পলাতক রয়েছেন এবং তাদের নামে একাধিক মামলাও রয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর কালীগঞ্জেও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা মাঠে নেই। নেতাকর্মীরা পালিয়ে গেছেন, না হয় আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে নেই বললেই চলে। কালীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম রবীন হোসেন ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন। এই শূন্যতায় রাজনৈতিক মাঠে জামায়াতকে একটি বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন ভোটারদের অনেকেই।

এ আসনে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের ডা: আফসার উদ্দিন মোল্লা, ১৯৯৬ সালে ডাকসুর সাবেক ভিপি আখতারউজ্জামান, ২০০১ সালে বিএনপির এ কে এম ফজলুল হক মিলন এবং ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে টানা তিনবার মেহের আফরোজ চুমকী এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবের পর জামায়াত নেতাকর্মীরা ঘরে ঘরে পৌঁছে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় দলটির প্রতি জনসমর্থন অনেকে বেড়েছে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান ও জনতার দলের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আজম খান রয়েছেন। আজম খান সাত বছর আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে জাতীয় পার্টির রাজনীতি থেকে অবসর নেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর পূনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসেন তিনি। গণফোরামের মো: কাজল ভূঁইয়া, জাতীয় পার্টির মো: সফিউদ্দিন সরকার ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর ১৪ দলীয় জোটের ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মো: আল আমিন দেওয়ানও এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করছে।

ভোটারদের মতে, এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটার ও তরুণদের ভূমিকা হবে নির্ণায়ক। দীর্ঘ দিন ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ থেকে এবার তারা কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ফলে গাজীপুর-৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো এলাকা।