মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) স্থাপন প্রকল্পে ৯ শতাংশ টাকা ঘুষ দাবির আলোচিত ঘটনার রেষ কাটতে না কাটতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় কাজ এবার আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠদের দেয়ার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে প্রতিষ্ঠনকে কাজ দেয়ার আয়োজন চলছে, তাদের এই ধরনের কাজের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাই নেই। এ ছাড়া কাজে ব্যর্থতার দায়ে প্রতিষ্ঠানটির ওয়ার্ক অর্ডারও বাতিলের রেকর্ড় রয়েছে। জানা গেছে, এই প্রকল্পে বড় ধরনের অনৈতিক আর্থিক লেনেদেনের মাধ্যমে অনভিজ্ঞ আওয়ামী সমর্থিত মালিকের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। আগামী ক্রয় কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হবে বলে জানা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার পরিবর্তে পুরস্কৃত করার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭৭৭ কোটি টাকার ছয়টি প্যাকেজের নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫৫৪ কোটি টাকায় বেজমেন্টসহ ১ হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, ১০৩ কোটি টাকায় ৯ তলা একাডেমিক ভবন, ২৬ কোটি টাকায় ভিসির তিনতলা অফিস ভবন, ৩৬ কোটি টাকায় পুরুষ ও নারী নার্সদের জন্য আলাদা দু’টি ডরমিটরি ভবন নির্মাণ, ১১ কোটি টাকায় মসজিদ, ৩৬ কোটি টাকায় ভিসির বাসভবন ও ডে কেয়ার সেন্টার এবং ১১ কোটি টাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট নির্মাণ।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি দরপত্র প্রক্রিয়ায় নানা অসঙ্গতি ও অনিয়ম তুলে ধরে রাজশাহীর মেসার্স তাবাসসুম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছেন। এর মধ্যেই জেনিট করপোরেশন নামের আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আতাউর রহমান টিপু অভিযোগ করেছেন, কাজ দিতে ভিসি তার কাছে ৯ শতাংশ ঘুষ দাবি করেছিলেন। যদিও পরে ভিসি আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
জানা যায়, রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল ফেসিলিটিজ বিল্ডিং নির্মাণের জন্য ৫৫৪ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ পাচ্ছে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশান লি.। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার পতিত আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার বেয়াই ও তার সরকারের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের আত্মীয়। তার বিরুদ্ধে গত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রভাব খাটিয়ে একাধিক কাজ বাগিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র মতে, ফেসিলিটিজ বিল্ডিং নির্মাণের দরপত্রে অংশগ্রহণকারীদের একই ধরনের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের কাজের অভিজ্ঞতা থাকার কথা উল্লেখ করা আছে। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড যে অভিজ্ঞতার সনদ দিয়েছে, সেগুলো এই দরপত্রের কাজের সাথে যথেষ্ট মিল নেই। এই হাসপাতাল প্রকল্পটি বড় ও জটিল একটি কাজ। ১১ তলা ভবন, বেইজমেন্ট, বিভিন্ন ইনফ্রাসট্রাকচারাল ওয়ার্ক, প্লামবিং ইলেক্ট্রিক্যাল ও বিল্ট-ইন ফেসিলিটিজ রয়েছে।
কিন্তু ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের দেখানো অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েয়ে সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের কাজ, যার সর্বোচ্চ ভবন তিনতলা এবং কোনো বেজমেন্ট নেই। তাই অভিযোগকারীরা মনে করছে, এগুলো হাসপাতালের মতো ১১ তলা ও বেইজমেন্টের জটিল বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের সাথে একই ধরনের কাজ নয়।
সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইটিটি ১৩.১ (বি) অনুযায়ী কমপক্ষে একটি বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের চুক্তির অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন যে অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সেটি হলো ৭৩ এনওএস স্কুল কাম ডিজাস্টার শেল্টার উইথ অ্যাসোসিয়েটেড কানেক্টিং রোড অর্থাৎ, ৭৩টি স্কুল/দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র এবং তার সাথে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজের অভিজ্ঞতা।
অভিযোগের মূল যুক্তি তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, ৭৩টি ছোট/ভিন্ন ধরনের ভবনের কাজকে একসাথে দেখিয়ে একটি বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের সিমিলার এক্সফেরিয়েন্স হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়, বিশেষ করে যখন কাজগুলোর ধরন, উচ্চতা, বেজমেন্ট, টেকনিক্যাল কমপ্লেক্সিটি এবং স্কোপ বর্তমান হাসপাতাল প্রকল্পের তুলনায় ভিন্ন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রামেবি স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক ও ভিসি অধ্যাপক ডা: জাওয়াদুল হক এ প্রতিবেদককে বলেন, যে ছয়টি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে তার মধ্যে একটির মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সেটি ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়া যাবে। বাকিগুলো মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে আনীত ঘুষবাণিজ্যসহ অভিযোগগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট।
রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যায়ের প্রকল্পের দরপত্রের আবেদনে কাজের অভিজ্ঞতাসহ সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানের মালিক ওয়াহিদ মিয়ার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি বিষয়টি জানিয়ে ম্যাসেজ পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
তবে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনে কর্মরত সোহেল পরিচয়ে এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। আমাদের কাজ ব্যবসা করা। যখন যে সরকার থাকবে তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড যে অভিজ্ঞতার সনদ দিয়েছে, সেগুলো এই দরপত্রের কাজের সাথে যথেষ্ট মিল নেই, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মূল্যায়ন করবেন।
সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময়েও কাজ শেষ না করার রেকর্ড রয়েছে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের। জানা গেছে, মিরপুর বাংলা কলেজের সামনে সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ে করতে না পারার কারণে গণপূর্ত বিভাগ তাদের ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল করেছে। যদিও পরে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই বাতিলাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
অভিযোগটির বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের মিরপুর ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: হাসিুনর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, তবে তারা ১৮ মাসের কাজ ৩০ মাসে শেষ করেছে। তারা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে দুইবার সময় নিয়েছিল।
সমালোচকদের দাবি, বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠরা বিএনপির সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করেই অতীতের ধারাবাহিকতায় বড় বড় সিভিল কনস্ট্রাকশনের কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। গণপূর্ত অধিদফতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ই-জিপি টেন্ডারে কারিগরি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অন্য প্রতিযোগীদের বাদ দিয়ে এই সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেয়া হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে খতিয়ে দেখার দাবি তাদের।



