ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রায় দুই বছরে তিনজন সভাপতি পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কে আগে বোর্ডে বসবেন তা নিয়েই শুরু হয় লড়াই। ফারুক আহমেদের পর হঠাৎ করে বাংলাদেশে আসীন হন প্রবাসী আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আর সব শেষে দায়িত্ব নিয়েছেন তামিম ইকবাল। মজার বিষয় হলো যে প্রক্রিয়ায় তারা বা বোর্ডের পরিচালকেরা এসেছেন, তা ছিল অনেকটাই দৃষ্টিকটু। তিনজনই জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং তিনজনই ক্রিকেটের উন্নয়নের কথা বলেছেন কিংবা বলছেন। প্রথম দু’জনের বিদায় ঘণ্টা বাজলেও তৃতীয়জন অর্থাৎ তামিমের পথচলা আজসহ মাত্র তিন দিন।
২০১৩ সালে নাজমুল হাসান পাপন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মনোনীত পরিচালক ছিলেন। পরবর্তীতে পরিচালকরা সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন তাকে। ফলে সরকার মনোনীত ব্যক্তিই প্রকারান্তরে বিসিবি সভাপতি হয়েছেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে নাজমুল হাসান পাপন পদত্যাগের পর ফারুক আহমেদ বিসিবির সভাপতি হন। সেটাও গঠনতন্ত্রের ফাঁকফোকরে হলেও সরকারি প্রভাবেই হয়েছে। আবার ফারুক আহমেদকে সরিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুল বিসিবি সভাপতি হয়েছেন, সেটাও সরকারি প্রভাবেই। এখন আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড ভাঙা হয়েছে পুরোপুরি সরকারের ক্ষমতায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের আইন দেখিয়েই। আইসিসির গঠনতন্ত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের বিষয়ে আপত্তি থাকলেও বাংলাদেশে বারংবার সরকারি হস্তক্ষেপ হয়েছে।
প্রত্যেকেই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করেছেন, অথচ পরবর্তীতে প্রায় একই প্রক্রিয়ায় নিজেরাই দায়িত্বে এসেছেন, যা এক ধরনের দ্বিচারিতার সামিল। শুরুর দিকে ফারুক আহমেদকে ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছিল। হঠাৎ করেই তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তাকে সরিয়ে দেন। যদিও এর আগেই ফারুক বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পরে আবার সেই ফারুকই নতুন বোর্ডে সহসভাপতি হন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভাগ্য খুলে যাওয়ায় কখনো চিন্তাচেতনায় না থাকা আমিনুল ইসলাম বুলবুল সভাপতির চেয়ারে বসেন। পরে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সভাপতি হন। সারা জীবন সততার কথা বলা বুলবুলও চেয়ারের জন্য আপস করেছেন এমন অভিযোগ উঠেছে। নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
বর্তমান সরকার আসার পর বুলবুলের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়ে। গত বছরের অক্টোবরে বিসিবি নির্বাচন নিয়ে সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার ঘাটতির চিত্র, যা দেশের ক্রিকেট পরিচালনায় গভীর সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়। এর ধারাবাহিকতায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বুলবুলের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় জাতীয় ক্রীড় পরিষদ।
বুলবুলের সময়ে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে অন্য বিতর্কই বেশি আলোচিত হয়েছে। ক্লাবগুলো একটা পক্ষ সমর্থনে বেঁকে বসলে ঘরোয়া ক্রিকেটও সচল করতে ব্যর্থ হন বুলবুল। তা ছাড়া তার কিছু মন্তব্যও সমালোচনার জন্ম দেয়।
সব শেষে, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার বুলবুলের বোর্ড ভেঙে দিয়ে তামিম ইকবালকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে। তবে এই কমিটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এতে মন্ত্রী-এমপিদের আত্মীয়স্বজন থাকার অভিযোগও উঠেছে। যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের মতো করে বোর্ড গঠন করেছে। সঠিক প্রক্রিয়া কেউ মানেননি। মাঠের খেলার চেয়ে চেয়ারের লড়াইই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে ঢাকা পড়ে গেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-১ এ সিরিজ জয়।
এই প্রেক্ষাপটে তামিম ইকবাল দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রথম দিনেই তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও কিভাবে তা বাস্তবায়ন করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অপর দিকে আমিনুল ইসলাম বুলবুল এখনো নিজেকে সভাপতি দাবি করে বিবৃতি দিচ্ছেন।
তামিমকে বিসিসিআইয়ের শুভেচ্ছা
এক্সে দেয়া এক বার্তায় তামিমের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সহসভাপতি রাজীব শুক্লা লিখেছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হওয়ায় তামিম ইকবালকে অভিনন্দন। সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে তার নেতৃত্ব দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রিকেটের সম্ভাবনাকে আরো এগিয়ে নেবে।



