শাহ আলম নূর ফ্রান্স থেকে ফিরে
একসময় ইউরোপে বাংলাদেশী অভিবাসীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি স্থায়ী চাকরি। বৈধতা অর্জন, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং দেশে অর্থ পাঠানোর জন্য বেশির ভাগ প্রবাসীই শ্রমবাজারনির্ভর জীবন বেছে নিতেন। তবে গত এক দশকে সেই চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু চাকরির ওপর নির্ভর না করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন বাংলাদেশীরা। ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশী মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।
প্রবাসী উদ্যোক্তারা জানান, প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা মূলত শ্রমিক বা চাকরিজীবী হিসেবে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হলেও নতুন প্রজন্ম ব্যবসাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশীদের মালিকানায় রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, সুপারশপ, আমদানি-রফতানি প্রতিষ্ঠান, ট্রাভেল ও ট্যুরিজম কোম্পানি, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, লজিস্টিকস, ফ্যাশন হাউজ এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসার বিস্তার ঘটছে।
কমিউনিটি নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে বর্তমানে বাংলাদেশী মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। রাজধানী প্যারিসের গার দ্য নর, লা শাপেল ও সেইন্ট ডেনিস এলাকায় বাংলাদেশীদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন স্থানীয় অর্থনীতির দৃশ্যমান অংশ। একসময় ব্যবসা যেখানে রেস্টুরেন্ট ও মুদিদোকানে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, হোটেল, ট্রাভেল এজেন্সি, প্রযুক্তিপণ্য বিপণন, আসবাবপত্র, আমদানি-রফতানি এবং অনলাইন বাণিজ্যেও বাংলাদেশীদের বিনিয়োগ বাড়ছে।
ফ্রান্সপ্রবাসী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, চাকরিতে আয় সীমিত থাকে, কিন্তু ব্যবসার মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। তার মতে, অনেক তরুণ এখন চাকরির পাশাপাশি ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করছেন। শুধু ফ্রান্স নয়, পর্তুগালেও বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের সফলতা কমিউনিটিতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেখানে অনেকেই পাইকারি বাণিজ্য, পর্যটন এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণভিত্তিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন।
লিসবনে বসবাসরত উদ্যোক্তারা জানান, পর্তুগালে ব্যবসা নিবন্ধন প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। এ কারণে সেখানে বাংলাদেশীরা রেস্টুরেন্ট, দোকান, পর্যটনসেবা ও আমদানি-রফতানি ব্যবসায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন।
ইতালিতেও ব্যবসার ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় অনেক বাংলাদেশী ভ্রাম্যমাণ বা ক্ষুদ্র খুচরা ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকলেও এখন তারা স্থায়ী দোকান, পাইকারি সরবরাহ, ফুড সার্ভিস ও ই-কমার্স খাতে বিনিয়োগ করছেন। রোম, মিলান, ভেনিস ও বোলোনিয়ায় বাংলাদেশীদের পরিচালিত ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একইভাবে স্পেনেও শ্রমবাজার থেকে ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন অনেক প্রবাসী। রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, পরিবহন, পর্যটনসেবা ও পাইকারি বাণিজ্যে তাদের উপস্থিতি বাড়ছে।
অভিবাসন গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ইউরোপে বসবাসের ফলে বাংলাদেশীরা স্থানীয় বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশী কমিউনিটির সম্প্রসারণে একটি স্থায়ী ভোক্তা শ্রেণী তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ই-কমার্সের প্রসার ব্যবসা পরিচালনাকে আরো সহজ করেছে।
অভিবাসন ও উন্নয়নবিষয়ক গবেষক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশী অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগে তারা মূলত শ্রম বিক্রি করতেন, এখন পুঁজি বিনিয়োগ করছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছেন। তার ভাষায়, এটি প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির পরিপক্বতার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে শুধু ব্যক্তিগত আয়ই বাড়ছে না, নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় নাগরিকরাও কাজ করছেন, যা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।
ফ্রান্সপ্রবাসী ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠেছে ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্যবসা। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও যুক্তরাজ্যে জামদানি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবি, হ্যান্ডলুম ও হস্তশিল্প পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনেক নারী উদ্যোক্তাও সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এর ফলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরো বাড়ছে।
প্রবাসীরা বলছেন, এই ব্যবসা সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্যও ইতিবাচক। কারণ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে তৈরী পোশাক, খাদ্যপণ্য, মসলা, হস্তশিল্প ও পাটজাত পণ্যের রফতানি বাড়ছে। অনেক উদ্যোক্তা সরাসরি বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করছেন, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ইউরোপে উচ্চ করহার, কঠোর শ্রম আইন, তীব্র প্রতিযোগিতা, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সঙ্কট ব্যবসা পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরপরও বেশির ভাগ প্রবাসী মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে চাকরির তুলনায় ব্যবসায় সম্ভাবনা বেশি। কারণ এতে আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ইউরোপে বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেমন রেমিট্যান্স আসছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পণ্য ও সংস্কৃতির পরিচিতিও বাড়ছে। তার মতে, আগামী দশকে ইউরোপে বাংলাদেশী কমিউনিটির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তানির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর। ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইতালি ও স্পেনে যে ধারা শুরু হয়েছে তা ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষতা, সঠিক পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ইউরোপের মূলধারার অর্থনীতিতে বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হবে। তখন প্রবাসী বাংলাদেশীরা শুধু শ্রমশক্তি হিসেবেই নয়, সফল উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবেও বিশ্বে নতুন পরিচয় গড়ে তুলবেন।



