গাইড ব্যবসায়ীদের সাথে শিক্ষকদের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ
  • অনেকের বাসায় পৌঁছে যায় লোভনীয় উপঢৌকন
  • শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ

সহায়ক বইয়ের আড়ালে জমে উঠেছে বিক্রয় নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা। সারা দেশেই আড়ালে আবডালে এই গাইড বই ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখন সক্রিয় হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু প্রকাশনীর গাইড বই কিনতে বাধ্যও করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। সম্প্রতি বেশ কিছু স্কুলে রীতিমতো নোটিশ দিয়ে একটি কোম্পানির গাইড ও বই কিনতে প্রকাশ্যেই নোটিশ দেয়া হয়েছে। খোদ রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী মনিপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের নোটিশেও পাঞ্জেরী এবং অক্ষরপত্র প্রকাশনীর গাইড ও মূল বই কিনতে বলা হয়েছে।

এ দিকে সচেতন অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি সরকারের নজরে আনার তৎপরতাও চোখে পড়েছে। অভিভাবকদের একটি দল গত ৪ মার্চ শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। সেখানে রেজা কোরাইস নামে একটি অভিভাবক শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে উদ্দেশ্য করে লেখা আবেদনে বলেছেন, এনসিটিবি অনুমোদিত বইয়ের বাইরে বিভিন্ন প্রকাশনীর অননুমোদিত বই পাঠ্য করা ও ক্রয়ে বাধ্য করার বিষয়ে আমরা অভিভাবকদের পক্ষ থেকে আপনার জরুরি পদক্ষেপ কামনা করছি। এই অভিভাবক লিখেছেন, রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় দেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। যদিও সরকার শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে আসছে। কিন্তু মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ও অধ্যক্ষ বিভিন্ন প্রকাশনীর কাছ থেকে কমিশন নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য অননুমোদিত বই পাঠ্য করেছেন। এই অননুমোদিত বইয়ের তালিকায় শাখা প্রধানরা স্বাক্ষর করেছেন এবং শ্রেণী শিক্ষকরা বইয়ের তালিকা অভিভাবকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠিয়েছেন এবং কিনতে বলেছেন। এভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর অননুমোদিত বই ছাপানো হয়েছে যা মেধা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নয়, শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা আদায়ের জন্য। যেখানে সরকার বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে, সেখানে অতিরিক্ত বই চাপানো স্পষ্টভাবে আইন ও শিক্ষানীতি পরিপন্থী। অভিভাবকদের মধ্যে আমরা অনেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি প্রতি বছর এভাবে ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর বই ছাপিয়ে কমিশন বাবদ অর্ধকোটি টাকা নিয়েছে স্কুলের বর্তমান কমিটি।

প্রসঙ্গত সর্বশেষ এনসিটিবি আইন ২০১৮ এর ১৬(১) এর ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, ‘বোর্ড কর্তৃক পাঠ্যপুস্তক হিসেবে প্রণীত ও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত নহে বা বোর্ড কর্তৃক পাঠ্যপুস্তক হিসেবে অনুমোদিত নয়, এরূপ কোনো পুস্তককে কোনো বিদ্যালয়ের জন্য পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে না : তবে শর্ত থাকে যে, সরকার, সরকারি গেজেট প্রকাশন দ্বারা, কোনো বিদ্যালয় বা কোনো শ্রেণীর বিদ্যালয়কে এই ধারার প্রয়োগ হইতে অব্যাহতিপ্রদান করতে পারিবে। অতত্রব এই আইন অনুযায়ী এভাবে বই পাঠ্য করা আইনের লঙ্ঘন। অতএব এ বিষয়ে তদন্ত করে শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং দায়ী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আপনার হস্তক্ষেপ করার জন্য আমরা শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আপনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

এ দিকে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের একাধিক সূত্র গতকাল রোববার নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানায়, প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো: সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত গত ২১ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত নোটিশ ও বইয়ের তালিকা ২০২৬ অনুযায়ী প্রতিটি শ্রেণীর বইয়ের তালিকায় নির্দিষ্ট করে অক্ষরপত্র প্রকাশনীর বইয়ের নাম উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে। আবার সহায়ক বইয়ের তালিকায় অর্থাৎ গাইড বইয়ের তালিকাতেও নির্দিষ্ট করে পাঞ্জেরী প্রকাশনীর গাইড বই কিনতে শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

অপর দিকে মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঘিরে কমিশন বাণিজ্যের এই বিতর্ক অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ, অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রতি বছরের মতো চলতি শিক্ষাবর্ষেও সরকার শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দিয়েছে। এসব বই প্রস্তুত ও অনুমোদন করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। অভিযোগ রয়েছে, মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ এনসিটিবির বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকাশনীর ব্যাকরণ, ধর্ম শিক্ষা, চিত্রাঙ্কনসহ আরো কয়েকটি সহায়ক বইয়ের তালিকা তৈরি করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরবরাহ করেছে। কয়েকজন অভিভাবকের দাবি, এসব বই সংগ্রহের নির্দেশনা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ের শাখা প্রধান ও শ্রেণী শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বইয়ের তালিকা পাঠিয়েছেন এবং শ্রেণীকক্ষের বোর্ডেও সেই তালিকা লিখে দিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা দ্রুত বইগুলো সংগ্রহের জন্য চাপ অনুভব করছে।

এ ঘটনায় অনেক অভিভাবক আর্থিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একটি শ্রেণীর শিক্ষার্থীর জন্য সহায়ক বই কিনতে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। যেসব পরিবারে একাধিক সন্তান এই বিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের জন্য এই ব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সরকারি বই বিতরণের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন। বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিচালনা কমিটি বিভিন্ন প্রকাশনীর সাথে সমন্বয় করে কমিশনের বিনিময়ে এসব বই তালিকাভুক্ত করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় অর্ধকোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো: আজমল হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্য দিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো: সিরাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের বই কিনতে বাধ্য করা হয়নি; এগুলো কেবল সহায়ক বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাধ্যতামূলক না হলে তালিকা আকারে নোটিশ কেন দেয়া হয়েছে, এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা তিনি দেননি। ঘটনাটি নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অভিভাবকরা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত বইয়ের চাপ কমানোর দাবি জানিয়েছেন।