বাংলাদেশে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক অপরাধ ছিল না- এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় চর্চা। ফলে এই অপরাধের দায় এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সাবেক দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কিছু পুনরাবৃত্ত যুক্তি সামনে আনা হয়েছে। তদন্ত কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব দাবির কোনোটিই আইনি বা বাস্তব পরীক্ষায় টেকে না।
কমিশনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন স্পষ্ট : বাংলাদেশে গুম ছিল পরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় চর্চা।
দায় কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নয়, যারা আদেশ দিয়েছেন, যারা জানতেন, যারা চুপ ছিলেন এবং যারা পালাতে সুযোগ করে দিয়েছেন, তাদের সবার ওপরই দায় বর্তায়। এই দায় এড়ানোর সব যুক্তি, বাস্তবতা ও প্রমাণের সামনে টেকে না।
‘আগের দায়িত্বশীলদের সময় ঘটনা, তাই দায় আমাদের নয়’- এই যুক্তির ভ্রান্তি
একটি বহুল প্রচলিত দাবি হলো- গুমের ঘটনা ঘটেছে পূর্বসূরির সময়ে, বর্তমান বা পরবর্তী কর্মকর্তারা শুধু দায়িত্ব ‘উত্তরাধিকারসূত্রে’ পেয়েছেন। কিন্তু কমিশনের মতে, গুম কোনো এককালীন ঘটনা নয়। আইন অনুযায়ী, যত দিন একজন ব্যক্তি বেআইনিভাবে আটক থাকেন এবং তার অবস্থান গোপন রাখা হয়, তত দিন অপরাধটি চলমান থাকে; অর্থাৎ যিনি যে সময়ে আটক রাখার ক্ষমতা হাতে নিয়েছেন, সেই সময়ের জন্য দায়ও তার ওপর বর্তায়। দায়িত্ব বদলালেও দায় ভাঙে না, দায় স্থানান্তরিত হয়।
এই ব্যাখ্যা শুধু আন্তর্জাতিক আইনেই নয়, সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনেও স্বীকৃত। ব্রিগেডিয়ার আযমীর গুমসংক্রান্ত সেনা তদন্তে দেখা গেছে, প্রথমে যিনি আটকাদেশ দেন, তার পরবর্তী একাধিক ডিজিএফআইও একই মাত্রার দায় বহন করেন; কারণ তারা অবৈধ আটক অব্যাহত রেখেছিলেন।
‘আমরা জানতাম না’- উচ্চপদস্থদের অজ্ঞতার দাবি
কমিশনের সামনে আরেকটি নিয়মিত প্রশ্ন ছিল : ‘আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন আমি ব্যক্তিগতভাবে আদেশ দিয়েছি?’
আইন এখানে স্পষ্ট। কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানতেন বা জানা উচিত ছিল, অথচ ব্যবস্থা নেননি,এই ব্যর্থতাই দায় প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় : গুমের ঘটনা ছিল বহু বছরব্যাপী, সারাদেশজুড়ে, হাজারো ভুক্তভোগী নিয়ে; আদালতে হাজিরের ফাঁক, নিখোঁজের পুনরাবৃত্ত ধরন, পরিবার ও গণমাধ্যমের ধারাবাহিক অভিযোগ, সবই প্রকাশ্য ছিল; এত বড় পরিসরের অপরাধ সম্পর্কে ‘অজানা’ থাকার দাবি বাস্তবতাবিবর্জিত।
এর পাশাপাশি আটককেন্দ্র চালাতে খাবার বাজেট, পাহারা, ডিউটি রোস্টার, চিকিৎসা, সবই প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়- এগুলো কমান্ড পর্যায়ের অজ্ঞাতে চলা অসম্ভব।
প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য : জানত শীর্ষপর্যায়
কমিশনের সামনে দেয়া সাক্ষ্যগুলো অজ্ঞতার দাবিকে কার্যত ধ্বংস করে দেয়। সাবেক ডিজিএফআই ডিজি লে. জেনারেল আকবর হোসেন স্বীকার করেন, হুম্মাম কাদেরের গুম নিয়ে তিনি সরাসরি শেখ হাসিনার সাথে আলোচনা করেছিলেন। একাধিক ডিজিএফআই, সিটিটিসি ও র্যাব কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুমসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটি (জেআইসি) পর্যায়েই আলোচিত হতো। র্যাবের সাবেক ডিজি আবদুল্লাহ আল মামুন তার জবানবন্দীতে জানান, রাজনৈতিকভাবে ‘অপছন্দের’ ব্যক্তিদের তুলে এনে নির্যাতন ও গোপন আটক র্যাবের ভেতরে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। তিনি আরো জানান, এসব গুরুতর সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দফতর বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছ থেকেই আসত।
ভৌগোলিক বাস্তবতা : ‘চোখের সামনে’ গুম
কমিশনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণগুলোর একটি হলো আটক কেন্দ্রগুলোর অবস্থান।
* ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি ও সিটিটিসি ভবনে আটক কক্ষ ছিল কর্মকর্তাদের অফিসের পাশেই।
* বগুড়া, কক্সবাজার, দিনাজপুর, বাগেরহাট পুলিশ লাইনে আটক ছিল খোলা জায়গায়।
* র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ ছিল সদর দফতরের কয়েক মিনিট হাঁটার দূরত্বে।
কমিশনের ভাষায়, এসব স্থানে বন্দীদের উপস্থিতি দেখা ও শোনা, দুই-ই সম্ভব ছিল, ফলে ‘জানতাম না’, এই দাবি বাস্তবতার সাথে অসঙ্গত।
জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই : বিপরীত ফল
গুমকে অনেক সময় সন্ত্রাস দমনের ‘প্রয়োজনীয় হাতিয়ার’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু কমিশনের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গুম কখনো বৈধ নয়; বাস্তবে গুমের শিকারদের বড় অংশ ছিল রাজনৈতিক বিরোধী; আর নির্বাচন ও দমন-পীড়নের সময় গুম বাড়ত, যা এটিকে শাসন কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই প্রক্রিয়া বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করেছে; নিরপরাধ ও অপরাধীর পার্থক্য মুছে দিয়েছে এবং উল্টো দীর্ঘমেয়াদে উগ্রবাদ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
‘রগ অফিসার’ তত্ত্বের ভাঙন
কমিশনের মতে, গুম কোনো ‘দু-একজন বেপরোয়া অফিসার’-এর কাজ নয়। একই ধাঁচের অপহরণ; একই ধরনের আটককক্ষ; ইউনিট থেকে ইউনিটে হস্তান্তর এবং ভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। এসব কিছুই পরিকল্পনা, লজিস্টিক ও কেন্দ্রীয় অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।
সামরিক আইনে বিচার যথেষ্ট নয় কেন
সেনা কর্তৃপক্ষের একটি অবস্থান হলো- এসব অভিযোগ সেনা আইনে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কিন্তু কমিশনের বিশ্লেষণ : সেনা আইনে গুম বা কমান্ড রেসপনসিবিলিটি নেই; আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন (১৯৭৩) এসব অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এই আইনের অধীনে বেসামরিক আদালতের এখতিয়ার অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ তদন্তের অভিজ্ঞতাও আশাব্যঞ্জক নয়, তদন্ত বন্ধ, প্রতিবেদন নিখোঁজ এবং অভিযুক্তদের দেশত্যাগের ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ।



