চট্টগ্রাম ব্যুরো
বর্ষা শুরু হতেই আবারো ডেঙ্গুর আতঙ্কে চট্টগ্রাম। তবে এবার উদ্বেগ শুধু আক্রান্তের সংখ্যা নয়, রোগের ধরনও। আগের মতো তীব্র জ্বর বা সারা শরীরে অসহনীয় ব্যথা নয়- মৃদু জ্বর, শরীর ম্যাজম্যাজ ভাব, বমি, পেটব্যথা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা নিয়েই হাসপাতালে আসছেন অনেক রোগী। চিকিৎসকদের মতে, জ্বর কমে যাওয়ার পরই শুরু হচ্ছে সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়, যখন লিভার, কিডনি, এমনকি মস্তিষ্কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নগরের আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করেছে। একই সাথে রোগীর বাসার চারপাশে ৬০ বর্গফুট এলাকায় বিশেষ মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে প্রতি বছর একই ধরনের অভিযান চললেও কেন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসছে না?
আট ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ঝুঁঁকি
চসিকের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে জালালাবাদ, পাঁচলাইশ, উত্তর কাট্টলী, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, দক্ষিণ হালিশহর ও দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে এডিস মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।
ম্যালেরিয়া ও মশক-নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো: শরফুল ইসলাম জানিয়েছেন, এবার দুই ধরনের কৌশলে অভিযান চলছে। এর মধ্যে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে লার্ভিসাইড প্রয়োগ, ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে তার বাড়ি ও আশপাশের ৬০ বর্গফুট এলাকায় বিশেষ ¯েপ্র। এই কাজে ৬০ জন প্রশিক্ষিত কর্মীকে নিয়োজিত করা হয়েছে, যারা প্রতিদিন সিভিল সার্জনের তালিকা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাবে চলতি বছরে চট্টগ্রামে ৩১৭ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে জুন মাসেই ১২২ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং জুলাইয়ের প্রথম তিন দিনেই আরো ২৪ জন শনাক্ত হয়েছেন। একজনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়মিত তথ্য জমা দেয় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছেন বহু রোগী।
বদলে গেছে ডেঙ্গুর ধরন
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে এবার ডেঙ্গুর উপসর্গ আগের তুলনায় ভিন্ন। এবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বর নেই। শরীর ব্যথার পরিবর্তে অতিরিক্ত দুর্বলতা। র্যাশ অনেক কম। বমি ও তীব্র পেটব্যথা বেশি, পাতলা পায়খানা দেখা যাচ্ছে। জ্বর কমার ২৪-৭২ ঘণ্টার মধ্যেই প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে এবং লিভার ও কিডনির জটিলতা দ্রুত তৈরি হচ্ছে।
চমেকের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক রোগী জ্বর কমে যাওয়াকে সুস্থতার লক্ষণ মনে করে বাড়িতে থাকছেন। অথচ এই সময়টিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম ও ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মেডিসিন আউটডোরে ফিভার ক্লিনিক চালু করেছে। এখানে জ্বরের রোগীদের প্রাথমিক স্ক্রিনিং করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রথম দিনেই কয়েকজন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছে।
তবে হাসপাতালের চিকিৎসকদের অভিযোগ, আগে ডেঙ্গুর জন্য আলাদা ওয়ার্ড থাকলেও এবার সেটি হাম রোগীদের জন্য ব্যবহার হওয়ায় ডেঙ্গুরোগীদের আলাদা ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা ভয় বাড়াচ্ছে
চট্টগ্রামে গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষা শুরু হলে ডেঙ্গু দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ২০২৩ সালে আক্রান্ত ১৪ হাজার ৮৭, মৃত্যু ১০৭। ২০২৪ সালে আক্রান্ত চার হাজার ৩২৩, মৃত্যু ৪৫। ২০২৫ সালে আক্রান্ত চার হাজার ৮৬৪, মৃত্যু ২৭। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই আক্রান্ত তিন শতাধিক। অর্থাৎ প্রতি বছরই মৌসুম শুরু হওয়ার আগে সতর্কতার কথা বলা হলেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি রোগ নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক সচেতনতার একটি বড় পরীক্ষা। চসিক এবার রোগীকেন্দ্রিক ¯েপ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করার মতো নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। টেকসই সাফল্যের জন্য প্রয়োজন আগাম প্রতিরোধ, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, কঠোর নজরদারি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। অন্যথায় বর্ষার প্রতিটি মৌসুমেই চট্টগ্রামকে আবারো ডেঙ্গুর একই চক্রের মুখোমুখি হতে হবে।



