- কাজ উদ্বোধনেই পার দুই বছর এক মাস
- ২০২৪ সালের পর আবার নতুন টেন্ডার
অনুমোদিত মেয়াদে শেষ হয় না দেশের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্প। বিশেষ করে সড়ক উন্নয়নের প্রকল্পগুলো চলে বছরের পর বছর। খরচ বাড়ে লাফিয়ে। সাতক্ষীরা-সখিপুর-কালীগঞ্জ (জেড-৭৬০২) এবং কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেটখালী (জেড-৭৬১৭) মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ প্রকল্পটি টেন্ডার ও কাজ শুরু করতেই দুই বছর এক মাস শেষ। ৯১ শতাংশ কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ আছে আট মাস মাত্র। দুই বছর এক মাসে প্রকল্পের বাস্তব কাজের অগ্রগতি মাত্র ৮.৯৮ শতাংশ, যার জন্য খরচ হয়েছে মাত্র পৌনে ৪৮ কোটি টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, টেন্ডার-সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই প্রকল্পের অগ্রগতিতে এই দুরবস্থা। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে ফের টেন্ডার আহ্বান করা হয়।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলার যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে হাতে নেয়া হয়েছে সাতক্ষীরা-সখিপুর-কালীগঞ্জ (জেড-৭৬০২) এবং কালীগঞ্জ-শ্যামনগর-ভেটখালী (জেড-৭৬১৭) মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীতকরণ প্রকল্প। এটি সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর ও সীমান্তবর্তী ভেটখালী পর্যন্ত নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে পর্যটন কেন্দ্র সুন্দরবন এবং মুন্সীগঞ্জ যাতায়াত অনেক সহজ হবে। মূল প্রকল্পটি মোট ৮২২ কোটি ৪৪ লাখ ১২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদন দেয়া হয় ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর একনেক সভায়। প্রকল্পের অনুকূলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ২০০ কোটি টাকা। কাজের মন্থরগতির কারণে মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে প্রকল্প পরিচালক।
প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো
প্রকল্প পরিচালকের তথ্য মতে, প্রকল্পে যেসব কার্যক্রম করতে হবে সেগুলো হলো, ভূমি অধিগ্রহণ ০.৬৪৩৫ হেক্টর, মাটির কাজ (সড়ক বাঁধ প্রশস্তকরণ, নতুন নির্মাণ) ৮.৭১৭ লাখ ঘনমিটার, বিদ্যমান পেভমেন্ট মজবুতীকরণ ৩১.৩৫৪ কিলোমিটার, বিদ্যমান পেভমেন্ট পুনর্নির্মাণ ২৫.২৬৭ কিলোমিটার, বিদ্যমান সড়ক প্রশস্তকরণ ২৮.৩১৯ কিলোমিটার, হার্ড সোল্ডার নির্মাণ ২৯.৮৯৮ কিলোমিটার, সার্কেসিং (ডিবিএস বেইজ কোর্স এবং ডিবিএস ওয়ারিং কোর্স) ৫৬.৬২১ কিলোমিটার, রিজিড পেভমেন্ট নির্মাণ ৫.১০০ কিলোমিটার, আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ ২৪০.০০ মিটার (৪৯টি), সাড়ে ৭ কিলোমিটার কনক্রিট বক্স বা কাভার্ড ড্রেন নির্মাণ, ২৮টি বাস-বে (রিজিড পেভমেন্ট দ্বারা) নির্মাণ, ৩৪টি বাস-বে (ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট দ্বারা) নির্মাণ, কনক্রিট স্লোপ প্রোটেকশন নির্মাণ ৬৪১২.৫০ বর্গমিটার, আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ ১.৭ কিলোমিটার, আরসিসি প্যালিসাইডিং নির্মাণ ১৮.১০৯ কিলোমিটার, দু’টি চেনেলাইজড ইন্টারসেকশন নির্মাণ ইত্যাদি।
কাজের অগ্রগতি
দরপত্র সম্পন্ন করে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ৪৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যার বিপরীতে ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৮.৯৮ শতাংশ।
পটপরিবর্তনে টেন্ডার বাতিল
মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অনেক টেন্ডার বাতিল হয়েছিল। এটি পরবর্তীতে পুনঃটেন্ডার (জবঃবহফবৎ) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সচল করা হয়েছে। বিশেষ করে প্যাকেজ ডব্লিউপি-০৫ ও ডব্লিউপি-০৬-এর পূর্ত কাজের প্রস্তাব পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছে।
আরো ২ বছর সময় চায়
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালে ১ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালে ৩০ জুন পর্যন্ত। মেয়াদ মোট দুই বছর ৯ মাস। দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ করে সব প্যাকেজে ভৌত কাজ শুরু করতে দুই বছর এক মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নকাল অবশিষ্ট আছে মাত্র আট মাস। এত স্বল্প সময়ে প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, বিধায় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতীত মেয়াদ আরো দুই বছর বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
নতুন করে কিছু কাজ যুক্ত ও খরচ সাশ্রয়
প্রকল্প পরিচালকের তথ্য হলো সাতক্ষীরা-সখিপুর-কালীগঞ্জ সড়কের ৫ম কিলোমিটারে বাঁকাল সেতু ৫০ মিটার, ১৩তম কিলোমিটারে কুলিয়া সেতু ৬৩ মিটার এবং ১৮তম কিলোমিটারে পারুলিয়া সেতু ৩৬ মিটার সরু (৬.৫০ মিটার) এবং ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু চলমান এই প্রকল্পে সেতু তিনটির নির্মাণকাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রকল্প এলাকায় ১২টি বাজার আছে। কিন্তু বাজারগুলোতে প্রয়োজনের চেয়ে ড্রেন নির্মাণকাজ কম আছে। দুই পাশে ড্রেন নির্মাণ ছাড়া বাজারের পানি নিষ্কাশন সম্ভব নয়। প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে শহরাংশের ১ম ৫.৩০ কিলোমিটার চার লেনে উন্নয়ন কাজ ধরা ছিল। কিন্তু পরে ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ওই অংশ দুই লেন হিসেবে ধরা হয়।
একনেক কর্তৃক সেভাবে ডিপিপি অনুমোদন হয়। কিন্তু এই প্রকল্পের মোট ছয়টি প্যাকেজে ঠিকাদার প্রতিটিতে ন্যূনতম ১৬ শতাংশ বা এর অধিক নিম্নদরে দরপত্র দাখিল করায় প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১২৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। তা ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ খাতে প্রায় ৪৫ কোটি সাশ্রয় হবে; অর্থাৎ মোট ১৬৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। সেক্ষেত্রে ডিপিপি সংশোধনপূর্বক ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পভুক্ত সড়কের তিনটি সেতু, ড্রেন নির্মাণ এবং ১ম ৫.৩০ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীতকরণ করা সম্ভব।
এ দিকে প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পের কার্যক্রম ছয়টি প্যাকেজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সব প্যাকেজের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং কাজও চলমান। প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে একটি এলএ কেইস চলমান আছে। তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৭ ধারা সম্পন্ন হয়েছে। চূড়ান্ত প্রাক্কলন প্রস্তুতের কাজ চলছে। ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কারণে মূল সড়কের কাজ থেমে নেই না। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্প পরিচালককে জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শেষ করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।



