আতাহার খান
ঘ্রাণ
আমার আব্বার শরীরের ঘ্রাণ যতেœ ধরে রাখি বুকে
সারাক্ষণ, কী তার অজেয় মোহ,
অসীম ক্ষমতা, আনত শ্রদ্ধায়
মাথা নুয়ে আসে, মেরুদণ্ড বেঁকে
পিঠ হয় কুঁজো, সত্যি আমি ভাগ্যবান!
ভারসাম্যহীন এ সমাজে আমি এখনো টিকে আছি,
আমার আব্বার উত্তরাধিকারী আমি, তার শরীরের ঘ্রাণ
সযতেœ ধারণ করে আছি বলে
কষ্টের কঠিন বোঝা বয়ে নিয়ে অনায়াসে
পাড়ি দিতে পারি
শর্তে বাঁধা দীর্ঘ জটিল-কঠিন কালো পথ।
কিন্তু এ কী হলো, সেই ঘ্রাণ খ্ুঁজে কোথাও পাচ্ছি না আমি!
আশরাফ হাসান
চাইলেই কি ভোলা যায়
চাইলেই কি ভোলা যায় সব স্মৃতি
স্মৃতি তো আমারে শাসায় করে বেত্রাঘাত
প্রেমিক হামজার হৃদয় চিবিয়ে খাওয়া সেই হিন্দা
কখনো বা নরপিশাচী ইসাবেলা
নিষ্ঠুর গৃহবন্দী পোডায় অনলে
বন্ধ্যা নদীর মতো স্রোতহীন প্রেমহীন
ঘৃণার অতল গহ্বরে ডোবায়
চাইলেই কি ভোলা যায় সব স্মৃতি
খোঁড়া শালিকের মতো যার পাঁজর মেদহীন
বিবর্ণ আকাশের মতো যার কর্মক্লান্ত চোখ
কর্তব্যের দায়ভারে যার বেঁকে গেছে পীঠ
তারে হাবশি কয়েদির মতো টেনে টেনে মরু-অগ্নিতে
করে নারকীয় উল্লাস
বাঈজীর চোখের আগুনে পুড়ে যায় প্রেম
তারে কী করে ভোলা যায়!
চাইলেই কি ভোলা যায় সব স্মৃতি
তুষের নিভে যাওয়া মুমূর্ষু আগুনে
বর্ণবাদী যে হাত ছডায় জিঘাংসার মৌসুমি উৎপাত
কষ্টের ঘানি টানা স্কন্ধে যে তুলে দ্যায় বেওয়ারিশ বদনাম
তারে কী করে ভোলা যায়!
হুসাইন আলমগীর
দু’টি কবিতা
তুমি এসো
হেমন্ত না আসে, না আসুক
তুমি এসো...
কপোলে তোমার মেখে দেবো সোনা রোদ।
তুমি এলেই হেমন্ত আসে। হেমন্ত কি অদ্ভুত!
আগুনের ফুল
ভালোবাসা চেয়ো না বালিকা
এই নাও আগুনের ফুল।
চলো, পুড়ে খাক হই...
চলো, ছাই হয়ে মিশে রই হাওয়ার সংসারে।
পুড়লে যদি ভালোবাসা দীর্ঘজীবী হয়
পোড়াই তো ভালো।
কী বলো, ভালো না?
উম্মুল খায়ের
মনের কথা
ওইসব ঝর্ণা ছুটে চলেছে নদীর দিকে, দেখেছ কি?
আমার হৃদয় আজ ব্যর্থ ঝর্ণা, তাই কাঁদে অভিমানে
যেন নিউগিনি দ্বীপ, প্রবাল প্রাচীর ঘেরা মরা কীট
যেন ধু-ধু মরুভূমি, মরীচিকাময় বালুর সাগর!
তবু তোমাকে সাজাবো প্রেমের রেণুতে আদর সোহাগে
শিশিরমাখা শিউলি আদরে কুড়ায়ে গেঁথে দেবো নামে
মায়ার কাজল চোখে ভেজাব। বাহারি রোদে বুঁদ হয়ে
রঙধনু এঁকে দেবো কপালের ভাঁজে।
মেঘেদের মতো খুব কাছাকাছি থেকে জড়াজড়ি করে
ঘোরলাগা ঘোরে পেতে চাই তোমাকেই বিড়াল স্বভাবে
এই প্রাচীন কথাটা বলতে পারিনি হারানোর ভয়ে
যে চলে যাবার সে তো চলে যাবে, জানি
উড়াল পাখিরা থিতু হয় না, পুলকে ঘর বাঁধে না রে
হৃদয় জয়ের নেশা আজ ঝরাপাতা হয়ে ঝরে পড়ে
পুরান স্মৃতিরা তাই বেদন-দহনে পুড়ে ছাই হয়
মনের কথারা মনে থেকে যায়, হায়!!
হাই হাফিজ
কবিতার জয়োল্লাস
হ্নআজকাল আমার কালি-কলম
হ্নআর কবিতা লিখতে চায় না।
হ্নকবিতাই আমাকে লেখে অহর্নিশ!
হ্নআমার উ™£ান্ত অনুভূতির শিশুবৃক্ষে
হ্নছোট ছোট বাড়ন্ত কচিপাতায়
হ্ন নৈশব্দে দোল খায় চৈতালি হাওয়া।
হ্নশব্দশৈলী উপমা অলঙ্করণ ব্যঞ্জনারা
হ্নক্রমান্বয়ে গড়ে তোলে দ্রোহের পিড়ামিড!
হ্নসুখে দুঃখে হাসি কান্নায় নির্মাণ করে
হ্নমিত্রাক্ষর আর মাত্রাবৃত্তের কুঁড়েঘর!
হ্নউঠোনে উঠোনে খেলা করে গদ্য,
হ্নখোলা জানালায় উঁকি দেয় পদ্য,
হ্নআর আমি... হ্নকান পেতে শুনি
হ্নকবিতার জয়োল্লাস।
আর. কে. শাব্বীর আহমদ
তুমি আছো বলে
তুমি আছো বলে আমার হৃদয় নিশীথে
আলোর প্রদীপ জ্বলে।
যেমনি রাঙা ভোরে পৃথিবীটা হেসে ওঠে।
প্রতিনিয়ত তোমার মধুর বচন শুনি
যেমন শুনি ঐশী বাণীর সুর।
আকাশে ডানা মেলা পাখিরা
সুদুরে মিশে যায়
আমিও মিশে যাই তোমার
তোমার ভালোবাসার সমুদ্রজলে।
তোমার সুবাস পাই
শিশির ভেজা বকুল সুরভিতে
তোমার কুন্তল যেন মধু মক্ষিকার মৌচাক।
দু’টি চোখে অলৌকিক রোশনি
আমি অভিভূত হই সৃষ্টির
বৈচিত্র্যময় কারুকাজে।
খুঁজি তাবৎ পৃথিবীর সত্তাকে
তোমার পুষ্পপেলব অবয়বে।
মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন
ভোরের লাল চোখ
ভোরের ঝলসানো লাল চোখের চাহনিতে
আঁধার নেয় বিদায় স্ববান্ধবে
ভোর সাজায় তার একান্ত সঙ্গী দিনের সুরত
মেখে দেয় আলোর দেয়ালিকা।
নগরে নগরে গাঁয়ের আঁচলে বেজে ওঠে সাইরেন
ব্যস্তময় কোলাহলের নয়া ডাক
বিছিয়ে দেয়া সড়কের খসে যাওয়া ধূলি-কণা
দেয় তার সাক্ষ্য।
শিশিরের দৃষ্টি মুছে দেয় পাতার ধূসর রং
নড়েচড়ে জেগে উঠে পত্র পল্লব।
দানিউব নদীর উর্ভরী জল ঢেলে দেয় আরো কিছু
দেশ-মানচিত্রের সীমান্ত ঘেঁষে খরার চোখ ভিজিয়ে,
যেখানে দৈত্যাকার সুড়ঙ্গ চুষে নেয় জলের আমানত।
মহাকাল বিছিয়ে দেয় নয়া পাটি ভোরের ডাকে
আগামীর বন্দোবস্তে-কেউ কেউ নেমে পড়ে কলস্বরে কল্যাণের আহ্বানে
কেউ কেউ কুড়িয়ে নেয় অভিশাপ অকল্যাণে দিনমান খেটে।



