সঙ্কুচিত হচ্ছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের পথ

আমদানি-রফতানি লাইসেন্সে পদে পদে হয়রানি

Printed Edition

শামছুল ইসলাম

দেশের ব্যবসায়ীদের আমদানি ও রফতানির লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমদানি ও রফতানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী একজন ব্যবসায়ী তিন দিনের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও ফাইল আটকে রেখে পদে পদে হয়রানির ঘটনা ঘটছে। ইচ্ছেমতো নিয়মের বাইরে পরিবেশ সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সত্যয়িত প্রোফরমা ইনভয়েস কিংবা বণিক সমিতির সনদের অজুহাতে আটকে রাখা হচ্ছে লাইসেন্স এর কার্যক্রম। সংস্থাটির এমন অসহযোগিতার ফলে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ ও নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার পথ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দফতরে মাল্টিন্যাশনাল ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) পাওয়ার আবেদন নিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেছে নারায়ণগঞ্জের একটি শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বিএম ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এনসিসিআই) বৈধ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের আবেদন নিষ্পত্তিতে অহেতুক বিলম্ব করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের অন্য নির্দিষ্ট দু’টি চেম্বারের সদস্যপদ নিতে চাপ দিচ্ছেন।

গত ৬ জুলাই আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দফতর বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের নিবন্ধিত ঠিকানা নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এনসিসিআই) আওতাধীন এলাকায় হওয়ায় তারা আমদানি ও রফতানি নিয়ন্ত্রকের দফতরের (সিসিআইই) অধীন স্বীকৃত ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত চেম্বার হিসেবে ওই চেম্বারের সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের বারবার বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) অথবা চায়না-বাংলাদেশ জয়েন্ট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিবিজেসিসিআই) সদস্যপদ গ্রহণের জন্য মৌখিকভাবে চাপ দিচ্ছেন এবং জানিয়েছেন, এ দু’টি চেম্বারের যেকোনো একটির সদস্যপদ না নিলে তাদের মাল্টিন্যাশনাল আইআরসি দেয়া হবে না।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সিসিআইই কর্তৃক অনুমোদিত ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত স্বীকৃত সংগঠনগুলোর তালিকাভুক্ত একটি বৈধ চেম্বার। বিদ্যমান বিধিবিধান অনুযায়ী একটি স্বীকৃত ‘এ’ ক্যাটাগরির চেম্বারের সদস্য হওয়ার শর্ত তারা যথাযথভাবে পূরণ করেছে বলে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, অতিরিক্তভাবে অন্য কোনো নির্দিষ্ট চেম্বারের সদস্যপদ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আরোপের কোনো বিধান তাদের জানা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে বিডা ও বস্ত্র দফতরের স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও শিল্প আইআরসি প্রদান কিংবা ইমপোর্ট লিমিট বৃদ্ধির আবেদন মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার পরিদর্শনে যাওয়ার কথা থাকলেও পাঠানো হয় কর্মচারীসহ চার-পাঁচজনের টিম। সিটিজেন চার্টারের বাইরে গিয়ে মনগড়া নানা কাগজপত্রের অজুহাতে প্রতিনিয়ত আবেদন আটকে রাখা হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন চেম্বার বা সমিতির মেম্বারশিপ সনদ জমা দেয়ার পরও নানা তালবাহানায় নতুন নতুন মেম্বারশিপ চাওয়া হয়, যা স্পষ্টতই সেবা প্রার্থীদের হয়রানি ও অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার এক অভিনব কৌশলে পরিণত হয়েছে।

আমদানি ও রফতানি নিয়ন্ত্রকের দফতর, ঢাকার নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করছেন মো: মাসুদুল মান্নান। এই কর্মকর্তা ২০২২ সালের একটি ঘটনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০২৮-এর ৩(খ) বিধি মতে “অসদাচারণ” প্রমাণিত হওয়ায় বিধিমালার ৪ (২) (খ) অনুসারে দুই বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার শাস্তি পান। এ ছাড়াও এই কর্মকর্তা নিয়োগকারী কর্তৃপ না হওয়া সত্ত্বেও ঢাকা আঞ্চলিক অফিসে কর্মরত অফিস সহায়ক মো: আল আমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এ ছাড়াও বিদ্যমান আর্থিক বিধিমালা ও ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘনপূর্বক অকেজো ঘোষিত এবং নিলামে বিক্রয়ের জন্য প্রক্রিয়াধীন থাকা গাড়ি মেরামত বাবদ ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা ব্যয় করেন।

দফতরের সহকারী নিয়ন্ত্রক মো: ওবায়দুল্লাহ নয়ন বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ২০১৮ সাল থেকে টানা ৯ বছর ধরে একই অফিসে চেপে বসে আছেন। বুয়েটের আহসানউল্লাহ হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং আওয়ামী প্রকৌশলী পরিষদের (আইইবি) এই নেতা বুয়েট কাম্পাসে আবরার হত্যার পরে সাবেক ছাত্রলীগের নেতাদের মিছিলের সরকারি কর্মচারী হয়েও সামনের সারিতে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

গত ৫ আগস্টের পর প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে রদবদল হলেও রহস্যজনক কারণে মাসুদুল মান্নান ও ওবায়দুল্লাহ নয়ন বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিনষ্ট করতেই এই দোসররা এখনো পদে থেকে চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দফতরের প্রধান নিয়ন্ত্রক এ কে এম মকসুদুল আরেফিন বলেন, আমদানি-রফতানির লাইসেন্স পেতে হয়রানির সুযোগ নেই। বিএম ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমি অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে আছি। এটি সম্ভবত আমদের ঢাকা অফিসের ঘটনা। তারা এ বিষয়ে বলতে পারবে।