অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সংশোধনের ফলে ক’দিন সূচকের নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ফের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহের শুরুতে সূচকের টানা উন্নতির পর শেষ দিকে এসে সংশোধন ঘটে পুঁজিবাজারে। রোববার নতুন সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসটিই সংশোধনের মধ্যে পার করে দুই পুঁজিবাজার। গতকাল সোমবারও দিনের শুরুতে এ ধারা বজায় থাকলেও শেষদিকে এসে তা কাটিয়ে ওঠে বাজারগুলো। এতে দুই পুঁজিবাজারই দিনশেষে সূচকের কমবেশি উন্নতি ধরে রাখে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে সংশোধন পরবর্তী ফের স্বাভাবিক ধারায় ফেরার ইঙ্গিত হিসাবেই দেখছেন। তারা মনে করেন, বাজারে সূচক কতটুকু বাড়তে পারে তা যেমন নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারে না তেমনি সংশোধনের মাত্রা সম্পর্কেও কারো সুনির্দিষ্ট ধারণা থাকে না। প্রতিদিনের বাজারই এটি নির্ধারণ করে থাকে। গতকাল দিনের একটি বড় অংশই পুঁজিবাজারগুলোতে সূচক ছিল নেতিবাচক। কিন্তু শেষদিকে এসে বিক্রয়চাপ ক্রমে হ্রাস পেতে থাকলে উভয় বাজারেই ঊর্ধ্বমুখী রূপ নেয় সূচক যা অব্যাহত ছিল লেনদেন শেষ হওয়া পর্যন্ত। এতে দুই বাজারই সবগুলো সূচকের কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তবে দিনশেষে উভয় বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হলেও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো একটি বড় অংশই গতকাল মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির তালিকায় উঠে আসে। এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৮ দশমিক ৪২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৫ হাজার ৭২ দশমিক ১৪৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৮০ দশমিক ৫৭ পয়েন্টে। তবে দিনের শুরুতে বিক্রয়চাপের মুখে সূচকটি দ্রুত তা কাটিয়ে বেলা ১১টার দিকে ৫ হাজার ৮৫ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। লেনদেনের এ পর্যায়ে নতুন করে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে বেলা ১২টার পর নেমে আসে ৫ হাজার ৬৪ পয়েন্টে। সূচকের এ অবস্থান থেকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি বেলা ২টার পর ৫ হাজার ৮৮ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। এ সময় সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১৬ পয়েন্ট। তবে দিনের সমন্বয়শেষে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের একটি অংশ হারায় ডিএসই। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৬ ও ৪ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
ঢাকার মতো দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জও (সিএসই) গতকাল সবগুলো সূচকের কমবেশি উন্নতি ধরে রাখে। এখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৪৯ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৮৫ দশমিক ৫৭ ও ২৫ দশমিক ০৩ পয়েন্ট।
সূচকের উন্নতি ঘটলেও গতকাল অবনতি ঘটে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেনে। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৪৯২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৪ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৫২৬ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ১০ কোটি টাকা থেকে ৪ কোটি টাকায় নেমে আসে লেনদেন।
এ দিকে গতকাল পুঁজিবাজার আচরণের প্রধান দিকটি ছিল বীমা খাতের সংশোধন। গতকাল এ খাতে বড় ধরনের সংশোধন ঘটে। তবে সংশোধনে প্রায় পুরোটাই ছিল সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর। সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া সবগুলোই দরপতনের শিকার ছিল। অপর দিকে জীবনবীমা কোম্পানিগুলোর আচরণ ছিল ভিন্ন। জীবন বীমা অধিকাংশ কোম্পানিরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। এর ফলে মূল্যবৃদ্ধির দিক থেকে এগুলো যেমন এগিয়ে যায় তেমনি লেনদেনের দিক থেকেও। লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে সূচকের অবনতির পেছনে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর সংশোধনকেই সামনে আনছেন বিশ্লেষকরা। বীমা খাতের এ সংশোধনের পেছনেও খাতটি থেকে মুনাফা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়াই বড় ভূমিকা রাখে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বীমা খাত নিয়ে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তাতে এ খাত আবার যেকোনো সময়ই ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কারণ এ খাতের নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির দাম ইতোমধ্যে কিছুটা বাড়লেও বেশির ভাগ কোম্পানির মূল্যস্তর এখনো বিনিয়োগকারীদের নাগালের মধ্যে রয়েছে।
গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শীর্ষে ছিল জীবন বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। গতকাল ১৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৭ লাখ ১৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ১৪ কোটি ২২ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস উঠে আসে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে রূপালি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স ও ওরিয়ন ইনফিউশন। লেনদেনের পাশাপাশি সোমবার ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিরও শীর্ষে উঠে আসে জীবন বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এদিন কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। শেয়ারের চাহিদা থাকলেও বেশ কিছু সময় কোম্পানিটির শেয়ারের কোনো বিক্রেতা ছিল না। ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল চামড়া শিল্প খাতের এপেক্স ট্যানারি। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকার অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডেফোডিল কম্পিউটার, রূপালি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, শাইনপুকুর সিরামিকস, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও মুন্নু এগ্রো অ্যান্ড জেনারেল মেশিনারিজ।
গতকাল আবার ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নেয় বেশির ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার প্রথমেই ছিল এফএএস ফিন্যান্স। ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ দরপতনের শিকার হওয়া পিপলস লিজিং ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রোড, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, জি কিউ বলপেন, ফিনিক্স ফিন্যান্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স, প্যাসিফিক ডেনিমস ও নুরানি ডাইং।



