নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ফিলিস্তিনিদেরই মানবঢাল বানাত ইসরাইল
- গাজার আশ্রয় শিবিরে ৪৪ সাংবাদিককে হত্যা
- শ্চিম তীর ও জর্দানে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মহড়া শুরু
- নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের দূত কুশনার
যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও গাজা উপত্যকার জেইতুন এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী। একই সাথে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনুসে বিমান হামলা চালিয়েছে তারা। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার খবরে বলা হয়েছে, দখলদার ইসরাইলি সেনারা গাজার দক্ষিণ-পূর্ব জেইতুন এলাকায় বাড়িঘর ধ্বংস করছে এবং পূর্বাঞ্চলে ভারী গোলাবর্ষণ চালাচ্ছে। এ সময় আকাশে বিভিন্ন ধরনের ড্রোন টহল দেয় শহরের পশ্চিমাংশে।
ওয়াফা জানায়, ইসরাইলি যুদ্ধবিমান খান ইউনুসের উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলে ধারাবাহিক ভারী বিমান হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি শহরের উত্তরপূর্বে অবস্থিত জান্না এলাকায় ইসরাইলি সেনারা একাধিক কামানের গোলা নিক্ষেপ করেছে। অধিকাংশ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটছে হলুদ রেখার ওপারে। এটি বর্তমানে ইসরাইলি বাহিনীর দখলে থাকা ভূখণ্ড। হলুদ রেখা হলো সেই সীমানা, যেখানে ইসরাইলি বাহিনী ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে প্রত্যাহার করেছিল। এটি একটি অদৃশ্য সীমারেখা, যা গাজাকে প্রায় দুই ভাগে ভাগ করেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪১ জনে। আহত হয়েছেন আরো ৬১৯ জন এবং এখন পর্যন্ত ৫২৮টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরাইলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ১৭৬ জনে এবং আহতের সংখ্যা এক লাখ ৭০ হাজার ৬৯০।
ফিলিস্তিনিদেরই মানবঢাল বানাত ইসরাইল : ইসরাইলি সেনারা জানিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ চলাকালে সেনাদের মধ্যে নিয়মকানুন, নৈতিকতা ও আইনি সীমা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করার বিষয়টি অনেক সময় নির্ভর করেছে কেবল একজন মাত্র অফিসারের খেয়ালের ওপর। এই তথ্য উঠে এসেছে ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল আইটিভিতে সম্প্রচার হতে পাওয়া প্রামাণ্যচিত্র ‘ব্রেকিং র্যাংকস : ইনসাইড ইসরাইলস ওয়ার।’
প্রামাণ্যচিত্রে সৈন্যরা নিশ্চিত করেছেন, যুদ্ধ চলাকালে ‘ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষকে মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সত্য। এটি সেনাদের ভাষায় পরিচিত ‘মশা প্রোটোকল’ নামে। ড্যানিয়েল বলেন, ‘আপনি কোনো এক বেসামরিক লোককে টানেলে পাঠান। তার জামায় আইফোন বাঁধা থাকে। সে হাঁটতে হাঁটতে টানেলের মানচিত্র সেনাদের কাছে পাঠায়। এই কৌশলটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিটি ইউনিট নিজের মশা ব্যবহার শুরু করে।’
আইডিএফ এ বিষয়ে জানায়, ‘মানবঢাল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গভীরভাবে তদন্ত করা হয়। কিছু ঘটনার তদন্ত সামরিক পুলিশ ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন করছে।’ প্রামাণ্যচিত্রে স্যাম নামে এক ঠিকাদার বলেন, তিনি জিএইচএফের খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে কাজ করতেন এবং দেখেছেন, ইসরাইলি সৈন্যরা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে। তিনি বলেন, ‘দুই তরুণ খাদ্য নিতে দৌড়াচ্ছিল। হঠাৎ দেখি দুই সৈন্য হাঁটু গেড়ে বসে গুলি করল। দু’জনের মাথা পেছনে হেলে পড়ে গেল।’ আরেক ঘটনায়, এক আইডিএফ ট্যাংক খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের পাশে দাঁড়ানো একটি সাধারণ গাড়িতে গুলি চালায়। ভেতরে ছিল চারজন সাধারণ মানুষ।
জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, শুধু খাদ্যসহায়তা নিতে গিয়ে অন্তত ৯৪৪ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে জিএইচএফ ও আইডিএফ উভয়ই দাবি করেছে, তারা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। আইডিএফ বলেছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে চেষ্টা করে। তবে এ ধরনের ঘটনাগুলোর অভ্যন্তরীণ তদন্তে এখনো পর্যন্ত প্রায় কোনো শাস্তি বা জবাবদিহি হয়নি। প্রামাণ্যচিত্রে গাজায় থাকা অনেক ইসরাইলি সৈন্যের মানসিক বিপর্যয়ের কথাও উঠে এসেছে। ড্যানিয়েল বলেন, ‘তারা (ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ) আমার মধ্যে ইসরাইলি হিসেবে, আইডিএফ অফিসার হিসেবে যে গর্ব ছিল- সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন শুধু লজ্জাই অবশিষ্ট রয়ে গেছে।’
গাজার আশ্রয় শিবিরে ৪৪ সাংবাদিককে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী : ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের ইউনিয়নের অধীনস্থ ফ্রিডমস কমিটি রোববার জানিয়েছে, ইসরাইলি দখলদার বাহিনী গাজা উপত্যকার আশ্রয় শিবিরে ৪৪ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে হত্যা করেছে। কমিটি জানায়, এই সাংবাদিকরা সেই ২৫৪ জন গণমাধ্যমকর্মীর মধ্যে পড়েন, যারা ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন।
এই হামলাগুলো ছিল পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক, যেখানে হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্র ঘিরে থাকা শিবিরগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, এমনকি আশ্রয় এলাকায় সরাসরি স্নাইপার গুলি চালানো হয়েছে। কমিটি আরো জানায়, নিহত সাংবাদিকরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করতেন এবং তাদের অধিকাংশই আশ্রয় শিবিরে মানবিক পরিস্থিতি কাভার করার সময় নিহত হন। ইউনিয়ন বলেছে, এই ধরনের টার্গেটিং ফিলিস্তিনি সাংবাদিকতাকে চুপ করিয়ে দেয়ার এবং বিশ্ববাসীর কাছে সত্য পৌঁছাতে বাধা দেয়ার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা। তারা জোর দিয়ে বলেন, ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গাজায় কাজ করা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
পশ্চিমতীর ও জর্দানে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মহড়া : ইসরাইলি সেনাবাহিনী সোমবার থেকে দখলকৃত পশ্চিমতীর ও জর্দান উপত্যকায় তিন দিনব্যাপী একটি সামরিক মহড়া শুরু করেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সি। সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এই মহড়ায় ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হবে এবং এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিমান চলাচল বৃদ্ধি পাবে। ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কেএএন জানিয়েছে, এই মহড়ায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের মতো হামলা প্রতিহত করার অনুশীলন করা হবে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ইসরাইল গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ হামলা চালায়, যাতে ৬৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হন এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ।
একই সময়ে তেলআবিব দখলকৃত পশ্চিমতীরেও হামলা বাড়ায়, যেখানে এক হাজার ৬৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১০ হাজার ৩০০ জন আহত হন, ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান অনুযায়ী। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এক ঐতিহাসিক মতামতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজি) ঘোষণা করে, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল অবৈধ এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেম থেকে সব বসতি সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানায়।
নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের দূত কুশনার : যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার গতকাল সোমবার জেরুসালেমে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠক করেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর দফতর জানিয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বর্তমানে জেরুসালেমে তার দফতরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনারের সাথে বৈঠক করছেন। জেরুসালেম পোস্টে এ খবর জানা যায়। রোববার কুশনার ইসরাইলে পৌঁছান, গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে আলোচনা করতে। বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। আলোচনায় যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক দূত স্টিভ উইটকফেরও। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত মাসেই কুশনার ও উইটকফের সাথে বৈঠক করেছিলেন, যেখানে তারা অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি ও সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন।
গাজায় সেনা পাঠাবে না আরব আমিরাত : ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার জন্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা নেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের। কারণ এর কোনো স্পষ্ট কাঠামো নেই। দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ আবুধাবি কৌশলগত বিতর্ক ফোরামে বলেছেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো স্থিতিশীলতা বাহিনীতে একটি স্পষ্ট কাঠামো দেখতে পাচ্ছে না এবং এই পরিস্থিতিতে সম্ভবত এই বাহিনীতে অংশগ্রহণ করবে না।’খবর আল-আরাবিয়া, রয়টার্স, টাইমস অব ইসরাইল। মার্কিন-সমন্বিত আন্তর্জাতিক বাহিনীতে মিসর, কাতার ও তুরস্কের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই বাহিনী ‘খুব শিগগিরই’ গাজায় উপস্থিত হবে। কারণ দুই বছরের যুদ্ধের পর সেখানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইসরাইলের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক স্থাপনকারী কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে তেল সমৃদ্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাত অন্যতম।
সুড়ঙ্গে আটকা ফিলিস্তিনির নিরাপদ প্রত্যাবাসনের চেষ্টা তুরস্কের : গাজার সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে থাকা ২০০ বেসামরিক নাগরিকের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য তুরস্ক চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন এক তুর্কি কর্মকর্তা। রোববার রাতে এক জ্যেষ্ঠ তুর্কি কর্মকর্তা জানান, গাজার সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে থাকা প্রায় ২০০ বেসামরিক নাগরিকের নিরাপদে বেরিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে কাজ করছে তুরস্ক। এর আগে দেশটি এক দশকেরও বেশি সময় আগে সেখানে নিহত এক ইসরাইলি সেনার লাশ ফেরত আনতে সহায়তা করেছিল। সূত্র : মিডল ইস্ট আই।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তুরস্ক ১১ বছর পর হাদার গোল্ডিনের লাশ ইসরাইলে ফেরত পাঠাতে সফলভাবে সহায়তা করেছে, যা হামাসের যুদ্ধবিরতির প্রতি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।’ তিনি আরো যোগ করেন, আমরা বর্তমানে সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে থাকা প্রায় ২০০ গাজার বেসামরিক নাগরিকের নিরাপদে বেরিয়ে আসার জন্য কাজ করছি। উল্লেখ্য, তুরস্ক ছিল গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে সম্পাদিত ইসরাইল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ।


