এম এ রকিব শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
আসন্ন ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ও চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলে লাখো পর্যটকের সমাগম হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগান, বনাঞ্চল, পাহাড়, হাওর ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে প্রতি বছরই ঈদ ও সরকারি ছুটিতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ে এ অঞ্চলে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, এবার ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় ইতোমধ্যে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে ব্যাপক বুকিং শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ঈদের ছুটিতে অধিকাংশ আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কক্ষ শতভাগ পূর্ণ থাকবে বলে ধারণা তাদের।
মৌলভীবাজার ট্যুর অপারেটর অ্যান্ড ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মো: খালেদ হোসেন বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। এখানে চা-বাগান, বনভূমি, হাওর ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি মিলিয়ে ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। তবে পর্যটন শিল্পকে টেকসই করতে আরো দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন বলেন, এবারের ঈদে বিপুল পর্যটক সমাগম হবে। তবে যানজট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি শহরের যানজট নিরসনে প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি এবং বাইপাস সড়ক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।
ট্যুর গাইড পঙ্কজ বলেন, শ্রীমঙ্গলে এখনো আধুনিক পর্যটক তথ্যকেন্দ্র ও সান্ধ্যকালীন বিনোদনের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও হলিডে নাইট মার্কেট চালু করা গেলে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা আরো সমৃদ্ধ হবে। শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: কামাল হোসেন বলেন, শ্রীমঙ্গল আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে সড়ক, পার্কিং, স্যানিটেশন ও মানসম্মত আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী মো: সেলিম আহমেদ বলেন, ঈদের ছুটিতে চার-পাঁচ দিনের জন্য বিপুল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শুধু মৌসুমি পর্যটনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। এ খাতকে টেকসই করতে মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। তিনি জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ডিজিটাল প্রচারণা বৃদ্ধি ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
সিনিয়র সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অপরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা ঘাটতি পর্যটন শিল্পের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। তিনি ঈদের ছুটিতে শহরের পরিচ্ছন্নতা, সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানোর দাবি জানান।
ট্যুর গাইড লিটন বলেন, ময়লার স্তূপ, ফুটপাথ দখল ও পার্কিং সঙ্কট পর্যটকদের বিরূপ অভিজ্ঞতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পর্যটন নগরী হিসেবে শ্রীমঙ্গলকে আরো পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক করা প্রয়োজন।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র (বিটিআরআই), লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাইল হাওর, চা জাদুঘর, সাত রঙের চা, চা-কন্যা ভাস্কর্য, সীমান্ত পার্ক, হরিণছড়া গলফ মাঠ, বিভিন্ন খাসিয়া পুঞ্জি ও মনিপুরী সংস্কৃতি, নূরজাহান টি স্টেট, মাধবপুর লেক, হামহাম ও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতসহ অর্ধশতাধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। সহজ সড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে সারা বছরই পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। তবে সরকারি ছুটিতে পর্যটকের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের মুখপাত্র আরমান খান বলেন, ঈদের ছুটিতে ব্যাপক পর্যটক সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রচুর বুকিং ও ফোনকল আসছে।
চামুং রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ইকো ক্যাফের স্বত্বাধিকারী তাপস দাশ বলেন, ঈদের সময় পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জানান, স্থানীয় ও আদিবাসী খাবারের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতির স্বাদ দিতে বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো: কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। টহল জোরদারসহ সব সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করা হবে।
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, যানজট নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: জিয়াউর রহমান বলেন, পর্যটন খাতকে সুশৃঙ্খল করতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। পর্যটকদের ভোগান্তি কমাতে ঈদের আগেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় সভা করা হবে।



