বিশেষ সংবাদদাতা
রাজধানীর মতিঝিলের ব্যাংকপাড়ায় রোববার এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। একই স্থানে, একই দিনে কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান থেকে কর্মসূচি পালন করেন চাকরিচ্যুত ব্যাংককর্মী এবং ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা। একপক্ষের দাবি চাকরি পুনর্বহাল, অন্য পক্ষের দাবি ব্যাংক লুটের বিচার ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত। ফলে পরিস্থিতি শুধু একটি শ্রম-সঙ্কট নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর সঙ্কট ও আস্থাহীনতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে সামনে এসেছে।
সকাল থেকেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে জড়ো হতে থাকেন চাকরিচ্যুত কর্মীরা। সেখানে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে অপসারিত কর্মীদের চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানানো হয়। এ সময় তারা বিভিন্ন সেøাগান দেন এবং ‘মানবিক বিবেচনায়’ অবিলম্বে চাকরিতে পুনর্বহালের আহ্বান জানান। শুধু চাকরিতে ফেরানোর দাবিই নয়, তাদের বক্তব্যে উঠে আসে আরো বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দাবি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে নতুন পর্ষদ গঠন, এমডি ও ডিএমডিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদত্যাগ- এসব দাবিও উচ্চারিত হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থাপনায় ‘বৈষম্যমূলক’ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
তবে দুপুর সাড়ে ১২টার পর একই স্থানে পাল্টা কর্মসূচি পালন করে ‘ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ’। তাদের কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই চাকরিচ্যুত কর্মীরা এলাকা ত্যাগ করেন, ফলে সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। কিন্তু দুই পক্ষের অবস্থান যে সম্পূর্ণ বিপরীত-তা তাদের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমন্বয় পরিষদের সভাপতি নূরুন নবী মানিক পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেন, যা মূলত ব্যাংক লুটপাট ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান। তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি-এস আলম গ্রুপসহ ‘ব্যাংক লুটেরা’ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা। একইসাথে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, সম্প্রতি পাস হওয়া ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনের ১৮/ক ধারা বাতিল করা। এই ধারার মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকের আগের মালিকদের নির্দিষ্ট শর্তে আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের দাবি- এটি মূলত ‘লুটেরাদের পুনর্বাসনের আইনগত পথ’ তৈরি করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সমন্বয় পরিষদ আরো অভিযোগ করে, ব্যাংকের সামনে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘মব সৃষ্টি’ করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী, যারা এস আলম গ্রুপের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার দায় সরকারকে নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা। একইসাথে কোনো অবৈধ দখলদার গোষ্ঠীকে ব্যাংকে প্রবেশ করতে না দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। গ্রাহক পরিষদের আরেকটি দাবি ছিল, যেসব প্রকৃত মালিকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মালিকানা দখল করা হয়েছিল- তাদের কাছে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। এই দাবি ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ দিন ধরে চলা ‘দখল রাজনীতি’র অভিযোগকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সমন্বয় পরিষদ তাদের দাবি আদায়ে ১৫ দিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করে। এর মধ্যে রয়েছে- লিফলেট বিতরণ, অনলাইন প্রচারণা, জেলা-উপজেলায় মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ ও সেমিনার আয়োজন। অর্থাৎ বিষয়টিকে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত করার কৌশল নিয়েছে গ্রাহকপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের পর থেকে ধাপে ধাপে ইসলামী ব্যাংকসহ অন্তত সাতটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যাংক থেকে নাম-বেনামে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে তার বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা পরিবার ও এস আলমসহ ১০টি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থপাচার, ঋণ জালিয়াতি ও কর ফাঁকির অভিযোগে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করেছে। এসব তদন্তে ইতোমধ্যে নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য ১০টি লিড ব্যাংকও নির্ধারণ করা হয়েছে, যারা বিদেশী আইনিসহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (এনডিএ) করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান চলতি মাসের মধ্যেই এসব চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এ দিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে। অন্য দিকে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ দেয়া স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, চাকরিচ্যুতির বিষয়টি হঠাৎ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন করে গঠন করা হয়। এরপর ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে কর্মীদের সনদ যাচাই এবং মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়া হয়। যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি, শৃঙ্খলাভঙ্গ করেছেন বা অনিয়মে জড়িত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।



