অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
নানা ইস্যু নিয়ে মন্দায় আটকে থাকা দেশের পুঁজিবাজার স্বাভাবিক হতে চাইলেও পারছে না। দীর্ঘসময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব বিশে^র অন্য দেশগুলোর মতো দেশের পুঁজিবাজারকেও স্বাভাবিক হতে দেয়নি। ক’দিন আগে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করে। ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল দেশের পুঁজিবাজারও। এ পরিস্থিতিতে আবারো নতুন করে যুদ্ধ শুরুর খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। এতে নতুন করে সৃষ্ট বিক্রয়চাপে থমকে যায় বাজার। অবনতি ঘটে দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে তিন মাসেরও বেশি সময় দেশের পুঁজিবাজার সূচকের অস্বাভাবিক পতন ঘটে। সম্প্রতি বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠলে ওই সময় হারানো সূচকের একটি বড় অংশ ফিরে পায় পুঁজিবাজারগুলো। তা ছাড়া নতুন অর্থবছরের বাজেটে সরকারের দেয়া বিভিন্ন নীতি সহায়তার ঘোষণা ভালো অবস্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল পুঁজিবাজারকে। এরই মধ্যে উভয়পক্ষের আক্রমণ প্রতি আক্রমণ বিনিয়োগকারীদের আবারো শঙ্কিত করে তুলেছে। গতকাল লেনদেনের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা বাজারকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। বৃদ্ধি পায় বিক্রয়চাপ। এতে দিনশেষে উভয় বাজারেই সূচকের অবনতি ঘটে। একই সাথে হ্রাস পায় লেনদেনও।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১১ দশমিক ০১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৭৮১ দশমিক ২৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৭৭০ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১২ দশমিক ৬০ ও ১ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট। অনুরূপ দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬০ দশমিক ৫১ পয়েন্ট হারায় গতকাল। ১৫ হাজার ৫৩২ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ৪৭২ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১১২ দশমিক ৪৮ ও ৪০ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি কমেছে বাজারগুলোর লেনদেনও। ডিএসই গতকাল এক হাজার ১৫৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ২৩২ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রামে ৩০ কোটি টাকা থেকে ২৬ কোটিতে নামে লেনদেন।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। এটি না ঘটলে গতকাল বাজার আচরণ অন্যরকম হতে পারত। কারণ এর আগে দুই দিন বাজারে সংশোধন ঘটেছে। গতকাল আবার ঘুরে দাঁড়ানোর কথা। কিন্তু লেনদেনের শুরুর দিকে বাজার ভালো থাকলেও মাঝামাঝি সময়ে এসে বিক্রয়চাপ তৈরি হয় যা সূচকের পাশাপািশ লেনদেনকেও প্রভাবিত করে। তবে তারা মনে করেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না হলে আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে পুঁজিবাজার। কিন্তু বিপরীত কিছু ঘটলে বাজার আবারো মন্দায় আক্রান্ত হতে পারে।
এ দিকে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৭৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং কোম্পানি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)। এ বিষয়ে ব্যাংকটির মূলধন বৃদ্ধির সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মঙ্গলবার বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের ১০১৯তম সভায় ইউসিবি ব্যাংকের রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৭৭ কোটি ৫১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৪৯টি সাধারণ শেয়ার রাইট শেয়ার হিসেবে ইস্যু করবে। প্রতিটি রাইট শেয়ারের ইস্যু মূল্যও ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, শেয়ারহোল্ডাররা বিদ্যমান প্রতি দু’টি শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার (১:২ অনুপাতে) কেনার সুযোগ পাবেন। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউসিবি ব্যাংক মোট ৭৭৫ কোটি ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯০ টাকা সংগ্রহ করবে। বিএসইসি জানিয়েছে, রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত এই অর্থ ইউসিবি ব্যাংক তাদের নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহার করবে।
এ ছাড়া একই সভায় কমিশন শেয়ারবাজারে নতুন একটি ওপেন-অ্যান্ড (বে-মেয়াদি) মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের জন্য) ‘ব্লু-ওয়েলথ ফার্স্ট স্ট্যাবল রিটার্ন ফান্ড’-এর খসড়া প্রস্তাবপত্র (প্রসপেক্টাস) এবং এর সারসংক্ষেপের অনুমোদন দিয়েছে। বিএসইসির থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফান্ডটির প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৩০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ব্লু-ওয়েলথ অ্যাসেটস লিমিটেড নিজস্ব তহবিল থেকে তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। অবশিষ্ট ২৭ কোটি টাকার ইউনিট সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ফান্ডটির প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সম্পদ ব্যবস্থাপক (অ্যাসেট ম্যানেজার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে ব্লু-ওয়েলথ অ্যাসেটস লিমিটেড। এ ছাড়া ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (এসএলআইসি) এবং ফান্ডের হেফাজতকারী (কাস্টডিয়ান) হিসেবে দায়িত্বে থাকবে বহুজাতিক ব্যাংক কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন পিএলসি।
বিএসইসি জানিয়েছে, এ অনুমোদনের ফলে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর ফান্ডটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।



