বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিল মালিকরা ক্রমেই ভারতীয় তুলা থেকে সরে আসছেন। গুণগত মানের ধারাবাহিকতা না থাকা, দামের অস্থিরতা, রফতানি নীতিতে অনিশ্চয়তা এবং মানসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে গত চার বছরে ভারত থেকে তুলা আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে বাংলাদেশে তুলা আমদানিতে ভারতের বাজার অংশ ছিল ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে ভারত ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারীতে দেশ। তবে ২০২৫ সালে এসে সেই অংশীদারত্ব নেমে এসেছে মাত্র ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ভারত থেকে ১৫ লাখ ৭০ হাজার বেল তুলা আমদানি হলেও ২০২৫ সালে তা ২১ শতাংশের বেশি কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪০ হাজার বেলে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পতন কেবল এক বছরের নয়; বরং গত চার বছরে ধারাবাহিকভাবে ভারতের তুলার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে বাংলাদেশের মিলগুলো।
এ দিকে টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, ভারত সরকারের আকস্মিক রফতানি নিষেধাজ্ঞা, কোটা আরোপ এবং নীতিগত পরিবর্তনের কারণে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তুলার গুণগত মান দুর্বল এবং দামের অস্থিরতাও ভারতীয় তুলা আমদানি কমার জন্য বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
একটি শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল মিলের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভারতীয় তুলা আগে আমাদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে রফতানি নীতি বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় আমরা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছি। এখন মিলগুলো নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার তুলার দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত। ২০২৫ সালে ব্রাজিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করেছে। একই সাথে উচ্চমানের ও দূষণমুক্ত তুলার চাহিদা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রফতানিমুখী পোশাক শিল্পে এখন মান ও ট্রেসেবিলিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপ এবং প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশের কৌশল হিসেবেই মিল মালিকরা তুলার উৎসে এই পরিবর্তন আনছেন।
তারা বলছেন, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনাম ছাড়া প্রায় সব প্রধান রফতানিকারক দেশই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে। তারা বলছেন, মান ও দামের প্রতিযোগিতার কারণে ২০২৫ সালে ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া থেকে তুলা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কার শুল্কনীতিও যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বাংলাদেশে রফতানি বাড়াতে উৎসাহ জুগিয়েছে।
এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তুলা সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান আরো শক্ত করেছে ব্রাজিল। দেশটি মোট আমদানির ২৭ শতাংশ জোগান দিয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্রাজিল থেকে তুলা আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ১০ হাজার বেলে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১৫ লাখ ৬০ হাজার বেল। আমদানিমূল্য বেড়ে হয়েছে ৯৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিযোগিতামূলক দাম, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও মানের ধারাবাহিকতার কারণে সামগ্রিক আমদানি কমলেও ব্রাজিলের তুলা বাজারে এগিয়ে গেছে। অন্য দিকে ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে গেছে। ২০২৫ সালে ভারত থেকে তুলা আমদানি ২১ শতাংশের বেশি কমে ১২ লাখ ৪০ হাজার বেলে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার বেল। ফলে ভারতের বাজার অংশীদারত্ব কমে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে, যা এক বছর আগে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
টেক্সটাইল মিল মালিকরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের সুপারিশ এবং ট্রাম্প আমলের শুল্কনীতির কারণে তারা মার্কিন তুলা আমদানি বাড়িয়েছেন। একই সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উন্নয়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানিতে ডাবল ফিউমিগেশনের মতো কিছু শুল্ক ও অশুল্ক বাধা তুলে নিয়েছে।
২০২৫ সালে আফ্রিকার প্রধান কয়েকটি দেশ থেকে তুলা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বেনিন থেকে আমদানি ৩১ শতাংশ কমে ৮ লাখ বেলে নেমে এসেছে, ফলে দেশটির বাজার অংশীদারত্ব কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২ শতাংশে। বুরকিনা ফাসো থেকে আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে তিন লাখ ৮০ হাজার বেলে নেমেছে, আর মালি থেকে আমদানি কমেছে ৪১ শতাংশের বেশি হয়ে তিন লাখ ৫০ হাজার বেলে।
ক্যামেরুন, চাঁদ ও আইভরি কোস্ট থেকেও আমদানি কমেছে বা খুব সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। দুর্বল সুতা ও কাপড়ের আদেশের কারণে মিলগুলো আরো সতর্কভাবে তুলা সংগ্রহ করায় পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকার দেশগুলো বাজার অংশ হারিয়েছে।
কমনওয়েলথ অব ইন্ডিপেনডেন্ট স্টেটস (সিআইএস) দেশগুলো থেকে তুলা আমদানিতে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। ২০২৫ সালে এই অঞ্চল থেকে আমদানি ৫৭ শতাংশের বেশি কমে মাত্র ৬০ হাজার বেলে নেমেছে। বাণিজ্য বিঘœ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বছরওয়ারি কমতি থাকলেও বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তুলা আমদানিকারক দেশ, যার মূল চালিকা শক্তি রফতানিমুখী টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প।
এনভয় টেক্সটাইলসের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান সরাসরি মার্কিন ডিলারদের কাছ থেকে ২৫০ টন তুলা সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ২০০ টন ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে, বাকি অংশ আগামী সপ্তাহে আসার কথা। তিনি বলেন, ব্রাজিলের তুলার সাথে মিশ্রণে মার্কিন তুলা সবচেয়ে ভালো ফল দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের অনুরোধে তারা মার্কিন তুলা ব্যবহার করছেন, যদিও এর দাম অন্যান্য দেশের তুলার চেয়ে বেশি। ডেনিম উৎপাদনে দেখা গেছে, মার্কিন তুলার দাম পশ্চিম আফ্রিকার তুলার চেয়ে প্রায় ৩ সেন্ট এবং ব্রাজিলের তুলার চেয়ে প্রায় ৫ সেন্ট বেশি।
এনভয় টেক্সটাইলস বছরে প্রায় দুই হাজার ২০০ টন সুতা আমদানি করে প্রায় ৪৫ লাখ গজ ডেনিম কাপড় উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক ২৫ টন মিশ্র সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে ১২ দশমিক ৫ টন ইতোমধ্যে উৎপাদনে রয়েছে। বাকি সক্ষমতা চালু হবে, কারণ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বর্তমানে পথে রয়েছে।
স্কয়ার ডেনিমসের অপারেশনস পরিচালক সাঈদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, স্কয়ার টেক্সটাইলস প্রতিদিন প্রায় ২০০ মেট্রিক টন তুলা ব্যবহার করে, যার প্রায় ৩০ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তিনি জানান, তারা যুক্তবাষ্ট্র থেকে সামান্য পরিমাণে তুলা আমদানি বাড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি কাঁচামাল ব্যবহারে শুল্ক ছাড় ঘোষণা করে, তাহলে আমদানি আরো বাড়বে।
একটি শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল মিলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাদ দেয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, এতে পোশাক প্রস্তুতকারীরা পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ থেকে কাপড় আমদানিতে ঝুঁকতে পারেন, যা দেশীয় মিলগুলোর অর্ডারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, আরএমজি খাত যদি পর্যাপ্ত অর্ডার না পায়, তাহলে স্থানীয় মিলগুলো কিভাবে তাদের সুতা ও কাপড় বিক্রি করবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বড় টেক্সটাইল মিলের পরিচালক বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০০টি গার্মেন্ট কারখানায় সুতা সরবরাহ করে। এর মধ্যে এইচঅ্যান্ডএম ও ইনডিটেক্সের সরবরাহকারীরা মোট ক্রেতার প্রায় ৫০ শতাংশ। মজুদ তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এই দুই ক্রেতার কাছে বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। সুতা আমদানি বৃদ্ধি ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তাকে তিনি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।



