দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে ভারত কেন কূটনৈতিক উদ্যোগ হারাচ্ছে

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে- ভারত তার ঐতিহ্যগত আঞ্চলিক প্রভাব ও কূটনৈতিক উদ্যোগ ক্রমে হারাচ্ছে। আদর্শিক বক্তব্য, নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক কূটনীতি এবং আগ্রাসী রাজনৈতিক সঙ্কেত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারতের প্রতি দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা আস্থাকে ক্ষয় করেছে। এর ফলে, নয়াদিল্লি এখন একক কোনো দ্বিপক্ষীয় সঙ্কটে নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটি কাঠামোগত কৌশলগত পরিবর্তনের মুখোমুখি।

বাংলাদেশের সাথে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব, পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম সীমান্তে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে নীতিগত ও কৌশলগত পুনর্গঠন- সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়া এখন এমন এক পরিসরে প্রবেশ করছে যেখানে ভারত আর স্বাভাবিক নেতৃত্বের জায়গায় নেই। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক মহাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক ক্রমেই অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং বিকল্প খোঁজার প্রবণতায় আবদ্ধ হচ্ছে।

‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন : এক দশকেরও বেশি আগে ঘোষিত ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ (ঘবরমযনড়ঁৎযড়ড়ফ ঋরৎংঃ) নীতির লক্ষ্য ছিল সংযোগ, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে ভারতকে একটি সহযোগী আঞ্চলিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ, নেপাল ও মালদ্বীপকে ঋণসীমা সম্প্রসারণ- যার পরিমাণ বাংলাদেশে প্রায় ৭.৯ বিলিয়ন ডলার এবং নেপালে ১.৬ বিলিয়ন ডলার। প্রাথমিকভাবে পারস্পরিক নির্ভরতার একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছিল। অবকাঠামো, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে অর্থায়ন এবং দুর্যোগকালে মানবিক সহায়তাও ভারতের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার ইমেজ গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছিল।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই নীতির বাস্তবায়নে গুরুতর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভারতীয় ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা এবং অনুমোদনের একাধিক স্তর প্রকল্পগুলোর গতি রুদ্ধ করে। এর ফল হিসেবে বাংলাদেশ এক পর্যায়ে ১১টি ভারতীয় অর্থায়িত প্রকল্প বাতিল করে দেয়। নেপালও একই ধরনের অভিযোগ তোলে। ফলে ‘উন্নয়ন সহযোগিতা’ ধীরে ধীরে প্রতিবেশীদের চোখে ‘নিয়ন্ত্রণমূলক নির্ভরতা’ হিসেবে প্রতিভাত হতে শুরু করে।

আদর্শিক সঙ্কেত ও আস্থার সঙ্কট : এই বাস্তবায়নগত দুর্বলতার সাথে যুক্ত হয়েছে আদর্শিক সঙ্কেতের রাজনীতি। ‘অখণ্ড ভারত’-এর মতো ধারণা, হিন্দুত্ববাদী প্রতীক ব্যবহার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শীর্ষ নেতাদের আগ্রাসী বক্তব্য ভারতের কূটনীতিকে একটি সভ্যতামূলক ও আদর্শিক রূপ দিয়েছে। ২০২৩ সালে নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের সময় প্রদর্শিত মানচিত্রে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমারকে ভারতের অংশ হিসেবে দেখানো প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে গভীর কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে। যদিও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছে, তবু এই ধরনের প্রতীকী বার্তা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছে সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ বলেই বিবেচিত হয়েছে।

এই আদর্শিক বাগ্মিতা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জনপ্রিয় হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য তা সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। ফলে তারা ক্রমেই তাদের কৌশলগত বিকল্পগুলো বৈচিত্র্যময় করার পথে হাঁটছে।

বাংলাদেশ নেপাল ও দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত মোড় : বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার পতনের পর, নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কূটনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার এই প্রচেষ্টা ভারতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার পুরনো নীতি থেকে সরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

একই সাথে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ভারতবিরোধী অভিযোগ ঢাকায় ভারতীয় কূটনৈতিক স্থাপনায় আক্রমণের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সরাসরি প্রমাণ নেই, তবু জনমনে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে।

নেপালের ক্ষেত্রে ২০১৫-১৬ সালের অঘোষিত অবরোধ এখনো গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। এর পর থেকেই কাঠমান্ডু চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হয়ে ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় চীনের দিকে ঝুঁকেছে, আর মালদ্বীপে ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটেছে, যা ভারতের আঞ্চলিক অবস্থানের বড় ধাক্কা।

নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক কূটনীতি ও বহুমেরু দক্ষিণ এশিয়া : আদর্শিক সঙ্কেতের পাশাপাশি ভারতের নিরাপত্তা-প্রথম অবস্থানও আঞ্চলিক আস্থাকে ক্ষুণœ করছে। লাদাখে নতুন বিমানঘাঁটি, ভারত-পাকিস্তান ও ভারত-নেপাল সীমান্তে ড্রোন নজরদারি, বাংলাদেশ সীমান্তে ধারাবাহিক সামরিক মহড়া- এসব পদক্ষেপ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক হলেও কূটনৈতিক দৃষ্টিতে প্রতিবেশীদের মধ্যে ভীতি ও দূরত্ব বাড়াচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বহুমেরু বাস্তবতা দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। ছোট রাষ্ট্রগুলো আর কোনো একক শক্তির ছায়ায় থাকতে আগ্রহী নয়; বরং তারা ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিচ্ছে।

উপসংহার : ৬২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য আঞ্চলিক বাণিজ্য থাকা সত্ত্বেও ভারত তার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারছে না। কারণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, আস্থার সঙ্কটই এখন মূল প্রতিবন্ধক। আদর্শিক বাগ্মিতা ও নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক কূটনীতি ভারতের পূর্বে অর্জিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধাকে ক্ষয় করছে। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে ভারত যদি বাস্তববাদী, সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতিতে না ফেরে, তবে এই আঞ্চলিক প্রভাব ক্ষয়ের প্রবণতা আরো গভীর হবে।