- সরকারি এলএসডি ভ্যাকসিনের মান নিয়ে প্রশ্ন
- একই ভ্যাকসিন বারবার ভ্যালিডেশনে বিশেষ সুবিধা নেয়ার ‘ছক’
বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশ, যেখানে গবাদিপশু ও পোলট্র্রি খাত লাখ লাখ পরিবার এবং তরুণ উদ্যোক্তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন। এই খাতের সুরক্ষা, ব্যাধি প্রতিরোধ এবং গবেষণার মাধ্যমে খাতকে এগিয়ে নিতে জাতীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে সাভারের বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। তবে এটি এখন অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রতিষ্ঠানটিতে উদ্ভাবিত গবাদিপশুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) এবং পোলট্রির এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৯এন২) ভ্যাকসিনের হস্তান্তর, কার্যকারিতা ও ফিল্ড ট্রায়াল নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। একদিকে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের নি¤œমান ও অকার্যকারিতা নিয়ে খামারিদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। অন্যদিকে একই ভ্যাকসিনের ভুয়া ট্রায়াল দেখিয়ে বিশেষ সুবিধা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইনস্টিটিউটের গবেষণাগারে বিষাক্ত কেমিক্যাল ফেলার মতো মারাত্মক পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার হাতে পুরো প্রতিষ্ঠান জিম্মি হয়ে পড়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ এইচ৯এন২ টিকাবীজ ও গোটপক্স ভ্যাকসিন হস্তান্তরে বিলম্ব ও নথিপত্রের অনিয়মের কারণে বিএলআরআই-কে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
নথিপত্র অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিএলআরআইর ‘জুনোসিস এবং আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ’ নামক প্রকল্প প্রায় ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ জুলাই ২০১৯ থেকে ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এই প্রকল্পের একটি গবেষণা ব্যয়ই ধরা হয়েছিল পাঁচ কোটি টাকা। প্রকল্পের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল ২৫টি প্রযুক্তি এবং ছয়টি ভ্যাকসিন সিড উপহার দেয়া। তবে পাঁচ বছরেও শেষে তেমন কোনো সফল গবেষণা সম্পন্ন হয়নি। ছয়টি ভ্যাকসিনের মধ্যে কেবল এলএসডি ও এইচ৯এন২ টিকাবীজ উদ্ভাবন ও ভ্যালিডেশন কাগজপত্রে সম্পন্ন দেখানো হয়। ৩০ জুন ২০২৪ তারিখে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এলএসডি ও এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার এইচ৯এন২ টিকাবীজ হস্তান্তর করার কথা ছিল। তা হস্তান্তরে ২০২৪ সালের ২৩ জুন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের (ডিএলএস) তৎকালীন মহাপরিচালক ডা: মো: রেয়াজুল হককে চিঠি দিয়ে অবহিত করেন বিএলআরআইর তৎকালীন ডিজি ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২৭ জুন (২০২৪) বিএলআরআই উদ্ভাবিত ‘বিএলআরআই এ/এইচ৯এন২’ প্রযুক্তিটি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ শিক্ষক, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ও বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ভ্যালিডেশন কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। প্রায় একই সময়ে এলএসডি ভ্যাকসিন হস্তান্তরের জন্যও চিঠি পাঠানো হয়। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, দু’টি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও গবেষণার নথিপত্রে চরম অসঙ্গতি থাকায় ডিএলএস-এর তখনকার ডিজি ডা: রেয়াজুল হক তা গ্রহণে অসম্মতি জানান। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ভ্যাকসিন হস্তান্তর স্থবির হয়ে পড়ে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএলআরআই-এর সিনিয়র কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ড. মুহাম্মদ আবদুস সামাদ নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তারকে ভুল বুঝিয়ে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলএসডি ভ্যাকসিন সিডটি প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কাছে হস্তান্তর করান। প্রকল্প শেষ হওয়ার আট মাস পর বিলাসবহুল হোটেলে এমন হস্তান্তরের অর্থ কোথা থেকে জোগান দেয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। একই প্রকল্পের আওতায় এইচ৯এন২ ভ্যাকসিনটির ভ্যালিডেশনও সম্পন্ন হয়েছিল অনেক আগে। কিন্তু এলএসডি ভ্যাকসিন হস্তান্তর করা হলেও এইচ৯এন২ ভ্যাকসিনটি সুকৌশলে আটকে রাখা হয়।
পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনৈতিক সরকার হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণের নতুন চেষ্টা শুরু হয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতি উপজেলায় পশু-রোগ প্রতিষেধক ঔষধের জোগান নিশ্চিত করা এবং ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা যুক্ত করা হলে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিএলআরআই উদ্ভাবিত এইচ৯এন২ ভ্যাকসিন হস্তান্তরের বিষয়টিকে এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এর ভিত্তিতে চলতি আগস্ট মাসে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কাছে এটি হস্তান্তরের কথা বলা হয় এবং নতুন করে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত এইচ৯এন২ ভ্যাকসিনের ফিল্ড ট্রায়াল ও ভ্যালিডেশনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মেয়াদ শেষ হওয়া প্রকল্পের ভ্যাকসিন নতুন করে ভ্যালিডেশন করার এই উদ্যোগ কেবল অর্থ অপচয় ও দৃষ্টি আকর্ষণের অপকৌশল। যেখানে ২০১৯-২০২৪ মেয়াদের প্রকল্পেই ভ্যাকসিনটির গবেষণা ও ভ্যালিডেশন সমাপ্ত দেখিয়ে হস্তান্তরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল (যার দাফতরিক নথি ড. সামাদ নিজেই ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট স্বাক্ষর করেছিলেন), সেখানে নতুন করে ট্রায়াল চালানোর অর্থ হলো সরকারি তহবিলের অপব্যবহার করা। কিন্তু বর্তমানে প্রকল্প শেষ হওয়া সত্ত্বেও এসব ট্রায়ালের খরচের উৎস কোথায়, তা নিয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
এ দিকে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৯এন২) এবং গোটপক্স ভ্যাকসিনের হস্তান্তরে দীর্ঘ বিলম্বের ঘটনায় বিএলআরআই-এর কার্যক্রমের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। গত ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ-২ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে সাত দিনের মধ্যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। নীতিমালার ৪.৪ ধারা অনুযায়ী ভ্যালিডেশন শেষ হওয়া মাত্রই প্রযুক্তি হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা না মেনে বারবার কালক্ষেপণ করা হয়েছে।
তবে এই শোকজ চিঠিতেও ভুল তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, এইচ৯এন২ টিকাবীজ উদ্ভাবন ও ভ্যালিডেশন নাকি ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে শেষ হয়েছে এবং গোটপক্স ভ্যাকসিনের জন্য ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কমিটি গঠিত হয়েছে।
অথচ দাফতরিক নথিতে পরিষ্কার দেখা যায়, ২০২৩ সালের আগস্ট মাসেই ড. সামাদ স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এইচ৯এন২ ভ্যাকসিনের ফিল্ড ট্রায়াল শেষ দেখিয়ে ২০২৪ সালের মার্চে এবং এলএসডি ভ্যাকসিনের হস্তান্তর ২০২৪ সালের এপ্রিলে নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অভিযোগের মূল তীর বিএলআরআই-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ আবদুস সামাদের দিকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি ইনস্টিটিউটের প্রশাসনিক ও গবেষণাসংক্রান্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। একাধিক মহাপরিচালককে প্রভাবিত করে তিনি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন। সরকারি বিধিমালা তোয়াক্কা না করে একই সাথে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা এবং একসাথে দু’টি বিশাল প্রকল্পের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালনের নজির গড়েছেন তিনি। আন্তঃসীমান্তীয় প্রাণিরোগ ও জুনোসিস গবেষণা প্রকল্প এবং বাংলাদেশের এএইচএসএ-এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ও জুনোসিস প্রতিরোধ প্রকল্পের পরিচালক পদের পাশাপাশি প্রাণিস্বাস্থ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান, ট্রান্সবাউন্ডারি অ্যানিমেল ডিজিজ সেন্টারের দফতর প্রধান এবং ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ফর অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ নানা পদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বিএলআরআইতে প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে সিন্ডিকেট গড়ার অভিযোগও রয়েছে।
গত ২৬ জুলাই প্রাণিস্বাস্থ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ নূরুজ্জামান মুন্সী বিএলআরআই ডিজিকে চিঠি দিয়ে জানান যে, জাতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবগুলোর ওপর অবৈধভাবে ‘ট্রান্সবাউন্ডারি অ্যানিমেল ডিজিজ রিসার্চ সেন্টার’-এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে মূল গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি আবার নিজেকে বর্তমান সরকার সমর্থক পরিচয়ে নতুন মেগা প্রকল্পের পিডি পদ বাগিয়ে নিতে তৎপর রয়েছেন বলে জানা যায়। এসব বিষয়ে কথা বলতে বিএলআরআই-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ আব্দুস সামাদকে গতকাল সন্ধায় কয়েকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি। ফোন ধরেননি মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুকও।
জানা যায়, বিএলআরআই উদ্ভাবিত এলএসডি ভ্যাকসিন মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতা দেখাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিএলআরআই-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বর্তমানে লাল তীর লাইভস্টকের পরিচালক ড. এমদাদুল হক জানান, তারা তাদের খামারে বিএলআরআই উদ্ভাবিত এলএসডি ভ্যাকসিন ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু প্রয়োগের পর পশুর শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়ায় বাধ্য হয়ে তারা এখন অতিরিক্ত খরচে আমদানিকৃত বিদেশী ভ্যাকসিন ব্যবহার করছেন। বিএলআরআই বিজ্ঞানীদের তদন্তের জন্য নমুনা নিতে বলা হলেও পরে আর কোনো ফিডব্যাক পাওয়া যায়নি। একই সুর মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম আমীর হামজা শাতিলের কণ্ঠে। তিনি জানান, দেশের বেশির ভাগ খামারি সরকারি এই ভ্যাকসিনটি সময়মতো পানই না। সরবরাহ সঙ্কট ও নি¤œমানের জটিলতার কারণে বহুগুণ বেশি দামে বিদেশী ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পশুপালন ব্যয় আকাশচুম্বী করে তুলছে।
উদ্ভূত বিতর্কের বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: শাহজামান খানকে ফোন করলেও রিসিভ করেননি। প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এলআরআই) এলএসডি ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ড. মো: মোস্তফা কামাল নয়া দিগন্তকে জানান, প্রযুক্তি হস্তান্তরের পর গত জুন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ ডোজ এলএসডি ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছে। চলতি বছরে ১৫ লাখ ডোজ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। খামারিদের অকার্যকারিতার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ ছাড়া কিছু বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া কোল্ড চেইন বজায় রাখা হয়েছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। তবে দেশে বছরে এক কোটি ডোজ চাহিদার বিপরীতে সরকারি উৎপাদন যে অপ্রতুল, তা তিনি স্বীকার করেন।



