যানবাহন সঙ্কটে পথে পথে ভোগান্তি : নেয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া

চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় খাবার জোগাতে সীমাহীন কষ্ট

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহে নজিরবিহীন হাহাকার পড়ে গেছে। মহেশখালী থেকে এলএনজির সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতির কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার বেশ শোচনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তারা। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বন্ধ রাখা হয় গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএলসহ গ্যাসনির্ভর অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও বাসাবাড়ির চুল্লি। বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় খাবার জোগাতেই নগরজুড়ে হাহাকার পড়ে গেছে। আর কর্মস্থলগামী ও কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া মানুষগুলোকে পোহাতে হয়েছে চরম যানবাহন সঙ্কট ও বাড়তি ভাড়ার ভোগান্তি।

এমনিতেই চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে গ্যাস সরবরাহের; যা মিলছিল তাও অনেকটাই আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর হয়ে পড়েছে। কিন্তু মহেশখালীতে স্থাপিত দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে সামিটের টার্মিনালটির স্টোরেজ খালি হয়ে গেলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানিকৃত এলএনজি লোড নেয়া যাচ্ছে না। ফলে টার্মিনালটি থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সরবরাহ শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এ ছাড়া এক্সিলারেটের অপর টার্মিনালটিও অগ্নিকাণ্ডের এক মাসের কাছাকাছি সময়েও এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি। ফলে সেই টার্মিনাল থেকে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি সরবরাহ মিলছে; অথচ ২টি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা।

এমনিতেই গ্যাসের চাপ সঙ্কটে গত এক মাস ধরে বিস্তীর্ণ এলাকার বাসাবাড়ির রান্নাবান্না ঠিকমতো করা যাচ্ছিল না। ফলে উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক সামগ্রী যেমন রাইস কুকার, ইলেকট্রিক কেটলী, ইনফ্রারেড কুকার, ইনডাকশন কুকার, ওয়াটার হিটার, মাইক্রোওভেন ইত্যাদির ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও এসবের ব্যবহার মারাত্মক চাপ বাড়িয়েছে। কিন্তু গ্যাস সঙ্কটে আবার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ চাহিদানুযায়ী বিদ্যুতের জোগানও দিতে পারছে না।

পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, গত বুধবার চট্টগ্রামে ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়। কিন্তু তাতেও তীব্র চাপ সঙ্কট বিরাজ করছিল। আর গতকাল সামিট টার্মিনালের সরবরাহ শূন্যের কোটায় নামলে সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়ে। সকাল থেকেই বাসাবাড়িতে গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় খাবারের হাহাকার পড়ে যায়। অনেকে হোটেলে হুমড়ি খেয়ে পড়েন, আবার অনেকে শুকনো খাবার খাইয়ে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়েছেন। তবে নগরবাসীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ধারণা সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়েই বাসাবাড়ির সরবরাহে সঙ্কোচনমূলক নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে।

এ দিকে গ্যাস সঙ্কটের কারণে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও ছিল গাড়ির দীর্ঘ লাইন। একেকটি গাড়ি গ্যাস সংগ্রহ করতে ৫-৬ ঘণ্টার বেশি লাগছিল। এর প্রভাব ছিল সড়কজুড়ে। পথে পথে শুধু মানুষ আর মানুষ, কিন্তু সে পরিমাণ যানবাহন নেই। ফলে গন্তব্যে পৌঁছাতে এক দিকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল, পাশাপাশি ভাড়া গুনতে হয় স্বাভাবিকের দ্বিগুণ।

আবদুল্লাহ ড্রাইভার নামের এক সিএনজিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, রাত ১০টায় লাইন ধরে সকাল ৮টায় দেড় শ’ টাকার গ্যাস পেয়েছি। আবার অনেকে এলপিজি দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। ফলে বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে। সিএনজির তুলনায় এলপিজির দাম কয়েকগুণ বেশি বলেও তিনি জানান।

এলএনজি জোগানের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের চট্টগ্রামস্থ কার্যালয়ের ডিজিএম (এলএনজি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, এলএনজি কার্গো বোঝাই জাহাজ প্রস্তুত থাকলেও বৈরী আবহাওয়ায় সামিটের টার্মিনালটিতে এলএনজি লোড করা যাচ্ছে না। ফলে টার্মিনালটি থেকে সরবরাহ শূন্যে নেমে এসেছে। এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

রুয়েটের হলে রান্না বন্ধ, বাইরে খেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের

রাজশাহী ব্যুরো ও রুয়েট প্রতিনিধি জানান, গ্যাসের সঙ্কটে রান্না বন্ধ হয়ে গেছে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হলের ডাইনিংয়ে। এতে পাঁচ শতাধিক আবাসিক শিক্ষার্থীর দুপুর ও রাতের মিল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে হলের বাইরে খেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা ও জীবনযাত্রায়ও ব্যাঘাত ঘটছে।

শুধু জিয়াউর রহমান হলই নয়, গ্যাসনির্ভর অন্য আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে এসব হলের রান্না ও মিল সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হল প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোনো হলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে খড়ি বা লাকড়ি দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব হলে আপাতত বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে ডাইনিং চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সব হলে এমন ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সঙ্কট হলে খাবার সরবরাহ নিয়ে জটিলতা বাড়তে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ দফতরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, গ্যাস সরবরাহে সাময়িক সঙ্কটের বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমাঞ্চলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারের সাথে তাদের কথা হয়েছে। চট্টগ্রামের এলপিজি টার্মিনাল-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সরবরাহে এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি কেন্দ্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক থেকে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের খাবারের সমস্যা যাতে না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি।’ রুয়েটের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, যেসব হলে বিকল্প জ্বালানিতে রান্নার ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে ডাইনিং চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হলে যেসব হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেই, সেখানে অস্থয়ীভাবে বাইরে চুলা স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রুয়েটের আবাসিক শিক্ষার্থীরা বলছেন, গ্যাস সঙ্কট শুধু রান্নার সমস্যা নয়; এর প্রভাব সরাসরি তাদের দৈনন্দিন জীবন ও পড়াশোনায় পড়ছে। বিশেষ করে হলের ডাইনিং বন্ধ থাকলে বাইরে খাবার সংগ্রহ করতে বাড়তি সময় ব্যয় করতে হয়। একই সাথে খাবারের খরচও বেড়ে যায়।

এ দিকে পশ্চিমাঞ্চলের গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের সাময়িক সঙ্কট জাতীয় পর্যায়ের সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালী গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটে। পরিস্থিতি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস দেয়া হচ্ছে। এর ফলে আবাসিক ও সাধারণ ভোক্তাপর্যায়ে গ্যাসের চাপ কমেছে।

প্রশাসন জানিয়েছে, গ্যাস পরিস্থিতি পর্যবেণে রাখা হয়েছে। সঙ্কট দ্রুত না কাটলে শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প জ্বালানি ও অস্থায়ী রান্নার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে।