- থার্টিফার্স্ট নাইটের জন্য আনা বিস্ফোরক ব্যবহারের শঙ্কা নাশকতায়
- পুলিশের লুট হওয়া ১৩৪০টি অস্ত্র ও গুলির হদিস নেই
- ওসমান হাদির খুনিদের ৩ অস্ত্রও আসে অবৈধ পথে
- প্রতিদিনই সীমান্তে দু-একটি অস্ত্র ধরা পড়ছে : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
- লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে : আইজিপি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে চাওয়া শরিফ ওসমান বিন হাদিকে যেভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় এরপর থেকেই নির্বাচনের মাঠে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে। গোয়েন্দাদের তথ্যমতে ওসমান হাদির অন্যতম খুনি ফয়সাল করিমের বান্ধবী মারিয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, ফয়সাল পালিয়ে যাওয়ার আগে বলে গেছে, ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ২১টি বাসায় অস্ত্রের মজুদ রাখা হয়েছে। আগামী নির্বাচন বানচাল করতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ওই অস্ত্রগুলো ঢাকায় এনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করবে। তবে গ্রামগুলোর নাম না বললেও মারিয়া ফয়সালের সাথে থাকায় ভারতের অনেক নেতাকর্মীকে অস্ত্র মজুদের বিষয়টি বলতে তিনি শুনেছেন বলে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন মারিয়া।
একইভাবে নাইক্ষ্যংছড়ি দিয়েও বিপুল অস্ত্র অবৈধভাবে ঢুকেছে বাংলাদেশে। ওই সূত্র আরো জানায়, এরই মধ্যে ভারত থেকে আসা বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এসেছে দেশে। বিশেষ করে মাদারীপুর ও শরীয়তপুর থেকে গান পাউডার ও বিস্ফোরকদ্রব্য রিফাইন্ড হয়ে ঢাকায় আনা হয়েছে। ওই বিস্ফোরক দ্রব্য ৩১ ডিসেম্বর থার্টিফার্স্ট নাইটে ব্যবহারের জন্য আনা হলেও নেপথ্যে সেগুলো ব্যবহার করা হবে নাশকতার জন্য তৈরি করা ককটেল ও বিস্ফোরকদ্রব্যে।
এক দিকে পুলিশের লুট হওয়া বৈধ অস্ত্রের ১৩৪০টি এবং আড়াই লাখ গুলি এখনো উদ্ধার হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরকের মজুদ বাড়লেও তা উদ্ধারে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় নির্বাচনের আগে যেভাবে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে তাতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি আরো বড় অঘটনের শঙ্কা রয়েছে। ওই সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিপুলসংখ্যক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশকে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। এর ফলে সহিংসতা, রাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শন এবং অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ১২ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরের দিন পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে চলন্ত মোটরসাইকেলে করে দুই ঘাতক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে নির্বাচনে প্রচারণার জন্য রিকশাযোগে যাওয়ার সময় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। যেটা সারা দেশে তোলপাড়ের সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয়, খুনিরা ভারতে পালিয়ে গেছে বলেও গত রোববার পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। গোয়েন্দাদের ধারণা অস্ত্রগুলো ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আনা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ফয়সালের কাছে পাঁচটি অস্ত্র মজুদ রেখেছিল। তার মধ্যে তিনটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। বাকি দুটি অস্ত্র ফয়সাল ও আলমগীর নিজের কাছে রেখেই ভারতে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনার ১০ দিনের মাথায় গত ২২ ডিসেম্বর খুলনার সোনাডাঙায় একটি বাড়িতে দলীয় অন্তঃকোন্দলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) খুলনা বিভাগীয় প্রধান ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হন। এর পাশাপাশি যশোর, চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া, পাবনাসহ ২০ জেলায় গত ১৪ মাসে প্রতিপক্ষের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে পাঁচ শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।
গোয়েন্দাদের তথ্যমতে পুলিশের লুট হওয়া বৈধ অস্ত্রের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। লুট হওয়ার এক বছর পর গত ১০ আগস্ট অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেও তেমন লাভ হয়নি। উল্টো আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি বাড়ছে। তবে এসব অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র রয়েছে কি না, তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলো অপরাধ সংঘটনের জন্য ব্যবহার করা হয়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীদের আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া দেয়ারও ঘটনা ধরা পড়েছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হতে না পারে সেজন্য অপরাধীগোষ্ঠী অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির জন্য এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রও যুক্ত হয়েছে। এটাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। এ কারণে গত ১০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বলা হয়, একটি লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধার করতে পারলে সন্ধানদাতা পাবেন পাঁচ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাব মেশিনগানের (এসএমজি) জন্য দেড় লাখ, চায়না রাইফেলের জন্য এক লাখ এবং পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। আর প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য মিলবে ৫০০ টাকা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার সময় পুলিশের হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩৭৫টি এবং গুলি ছিল দুই লাখ ৫৭ হাজার ৮৪৯টি।
পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাত্র ৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১৯০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো এক হাজার ৩৪০টি অস্ত্র এবং দুই লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৯ রাউন্ডেরও বেশি গুলি কোথায় তা অজানা। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে : রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), হালকা মেশিনগান (এলএমজি), বিভিন্ন ক্যালিবারের পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান এবং টিয়ারগ্যাস লঞ্চার ।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১৭ হাজার ২০০টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান করে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এসব আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করে। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩৪০টি জমা পড়ে। তিন হাজার ৮৬০টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো জমা দেয়া হয়নি। যারা অস্ত্র ও লাইসেন্সসহ আত্মসমর্পণ করেনি তাদের ওইসব আগ্নেয়াস্ত্র এখন ‘অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র’ বলে ঘোষণ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
লাইসেন্স বাতিল : সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক হাজার ১৭৭টি লাইসেন্স বাতিল করে। বাতিল করা লাইসেন্সের মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের। ঢাকায় সর্বোচ্চ ৭৯৬টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়। পাবনায় ১৪১টি, চট্টগ্রামে ৭৩টি, যশোরে ৬৬টি, সিলেটে ৬৩টি এবং কক্সবাজারে ৩৮টি লাইসেন্স বাতিল করা হয়। ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, অনেক লাইসেন্সধারী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আবার অনেকে আত্মগোপনে আছেন। অনেকেই দাবি করেছেন যে বিদ্রোহের সময় তাদের অস্ত্র চুরি হয়ে গেছে। মাহবুবুল আলম হানিফ, নিজাম উদ্দিন হাজারী, শামীম ওসমান ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ আওয়ামী লীগের নেতারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
নির্বাচনকে টার্গেট করে দেশে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে বলে স্বীকার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল সোমবার পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দফতরে আয়োজিত বিজিবি দিবস-২০২৫ উপলক্ষে অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দু-চারটি অস্ত্র যে ঢুকছে না, তা আমি বলব না। ঢুকছে এবং ধরাও পড়ছে। প্রতিদিন দু-একটা করে ধরা হচ্ছে। কোনো রকমের কোথাও ছাড় দেয়া হচ্ছে না।
লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা হবে আইজিপি : গতকাল পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখতে হবে। নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গতকাল সোমবার সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় বক্তব্য প্রদানকালে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের এ নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, প্রাক-নির্বাচনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়াতে হবে। পুলিশের টহল ছাড়াও চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশি জোরদার করতে হবে। আইজিপি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, পুলিশের আইনি কাজে কেউ কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করলে তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করতে হবে।
তিনি বলেন, থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার তৎপরতা বাড়াতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। তিনি লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সরকার ঘোষিত পুরস্কার সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।



