আলজাজিরা
দক্ষিণ লেবাননে যানবাহনে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ। একই সাথে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণের বাসিন্দাদের জন্য নতুন করে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ জারি করেছে।
গতকাল সোমবার ভোরে নাবাতিহ এলাকার কাফর রুমান-জারমাক মহাসড়ক এবং জারমাক-খারদালি সড়কে তিনটি যানবাহনকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে তিনজন নিহত হন। পরবর্তীতে, সম্ভাব্য হামলার আগে ইসরাইল ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এমন দাবি করে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র কর্নেল আভিচাই আদ্রায়ি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি বলেন, ইসরাইলি বাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছে। এরপর তিনি প্রধানত দক্ষিণ লেবাননে অবস্থিত গ্রামগুলোর নাম তালিকাভুক্ত করেন।
তিনি বলেন, আপনাদের নিরাপত্তার জন্য এখনই ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং এই শহর ও গ্রামগুলো থেকে অন্তত এক হাজার মিটার দূরে উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান নিতে হবে। ইসরাইলের এই হুমকি মূলত নাবাতিহ আল-তাহতা, আল-লুইজেহ, সাজদ, আইন কানা, হারুফ, জিবদিন, কফার রেমান, দুয়ের, আদশীত আল-শাকিফ এবং মায়দুন গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য জারি করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই দক্ষিণ লেবাননে অবস্থিত। দক্ষিণের শহর টায়ারের আরজৌন পৌরসভায় ইসরাইলি হামলায় দু’টি বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। আহতদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দল সেখানে কাজ করছে।
এ ছাড়াও ইসরাইলি বাহিনী আল-মানসুরি, সিদ্দিকিন, জিবকিন, কলাইয়া, ইয়োহমোর আল-শাকিফ, জাওতার আল-শারকিয়াহ এবং আল-হানিয়া শহরেও হামলা চালিয়েছে। বৈরুত থেকে আল জাজিরার জেইনা খোদর জানিয়েছেন, ইসরাইলি ড্রোনগুলো টানা দ্বিতীয় দিনের মতো লেবাননের রাজধানীর ওপর দিয়ে উড়ছে। তিনি বলেন, সেন্ট্রাল বৈরুত এবং রাজধানীর দক্ষিণের শহরতলির আকাশে কম উচ্চতায় বিরতিহীনভাবে ইসরাইলি ড্রোন উড়ে বেড়ানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ ইসরাইল এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ নেই
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী গতকাল সোমবার জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে চলমান সঙ্ঘাত ও হিজবুল্লাহর সাথে সংঘর্ষের সময় তাদের একজন সেনা নিহত হয়েছে। এই ঘটনায় আরেক সেনা সদস্য আহত হয়েছেন বলে সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। সঙ্ঘাত নতুন করে শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৩ জন ইসরাইলি সেনা এবং একজন বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত ১৭ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া এবং পরবর্তীতে তা জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত বাড়ানো সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতে ইসরাইলি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইসরাইলি প্রত্যাহার নিয়ে কোনো আপস নয়
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন গতকাল সোমবার বলেছেন, দেশ থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার একটি অলোচনা-অযোগ্য দাবি এবং ওয়াশিংটনে আগামী দফার আলোচনার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি এগিয়ে নেবে। প্রায় দুই দশকের দখলদারিত্বের পর ২০০০ সালে লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বার্ষিকী স্মরণে এক বিবৃতিতে আউন বলেন, এই বছর মুক্তিসংগ্রামের বার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে যখন লেবানন একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি বলেন, ইসরাইলি হামলা থামেনি এবং আমাদের প্রিয় দক্ষিণের গ্রামগুলো এখনো নতুন করে দখলদারিত্বের শিকার হয়ে কষ্ট পাচ্ছে। লেবানন ও ইসরাইল গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক আলোচনা শুরু করেছে এবং তারা জুনের শুরুতে চতুর্থ দফার বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর আগে ২৯ মে পেন্টাগনে সামরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম রোববার ইসরাইলের সাথে সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা এবং তার গোষ্ঠীর অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কাসেম বলেন, এই সরকার যদি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তাদের চলে যাওয়া উচিত। আমেরিকা যদি লেবানন রাষ্ট্রের কলকাঠি নাড়ে, তবে সার্বভৌমত্ব কোথায় থাকে?
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনা, যার লক্ষ্য ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধ করা, তা লেবাননের যুদ্ধ অবসানের ওপরেও আলোকপাত করছে।



