শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ কিডনি ৭০ শতাংশ অকেজো না হলে লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলে ৭০ শতাংশ নষ্ট হওয়ার আগে একজন মনে করতে পারেন যে, তিনি সুস্থ আছেন। তবে সুস্থ আছেন কি না তা জানতে সবার উচিত নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করে দেখা এবং নিয়মিত কিডনি-বিষয়ক চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া। শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করে দেয়ার সাথে সাথে কিডনি শরীরের রক্ত পরিশোধন করে থাকে।
একজন সুস্থ মানুষের সুস্থ কিডনি ২৪ ঘণ্টায় ২০০ লিটার রক্ত পরিশোধিত করে থাকে। এই রক্ত শোধন প্রক্রিয়ায় কিডনি শরীর থেকে এক থেকে তিন লিটার বর্জ্য প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কোনো কারণবশত রক্ত পরিশোধন বাধাপ্রাপ্ত হলে আকস্মিক বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হতে পারে। রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করে কিডনি সুস্থ আছে কি না জানা যায়। রক্তে ক্রিয়েটিনিন ছাড়াও প্রস্রাবে নির্দিষ্ট মাত্রার অধিক প্রোটিন বা এলবুমিন থাকলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ আছে বলে ধরা হয়। বাংলাদেশের তিন হাজার প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে ১১ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ শতাংশ এবং আইসল্যান্ডে ১০ শতাংশ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দুই কিডনির প্রতিটিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ ক্ষুদ্র ছাঁকনি বা ফিল্টার মেমব্রেন রয়েছে। জন্ম গ্রহণের ছয় সপ্তাহের মধ্যেই কিডনি তৈরি হয়ে যায়। তখন থেকে কিডনি পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হঠাৎ করে কোনো বিশেষ কারণে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। প্রায়ই লক্ষ করা যায়, খুব স্বল্প সময় এ অবস্থা স্থায়ী হয় এবং তবে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা পেলে কিডনি সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে যেতে পারে। তবে চিকিৎসায় বিলম্ব হলে অনেক ক্ষেত্রে কিডনি জিটলতাই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। একবার তাৎক্ষণিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে ভবিষ্যতে তাদের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায় বলে জানান বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা: মো: সাইফুল ইসলাম সেলিম।
নেফ্রলজিস্টরা বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কিডনি রোগ পানিশূন্যতা যা পাতলা পায়খানা, বমি ও বিভিন্ন কারণে রক্তক্ষরণ এবং পুড়ে যাওয়ার কারণে হয়ে থাকে। এ ছাড়া ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া, নেফ্রাইটিস, ভেজাল খাদ্য, বিভিন্ন ধরনের ওষুধের কারণে ও প্রস্রাবে বাধাজনিত কারণে কিডনি কিছু সময়ের জন্য বিকল হতে পারে। একটু সচেতন হলে কিডনির এই সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমনÑ পানিশূন্যতা দেখা দিলে সাথে সাথে খাবার স্যালাইন খাওয়ানো, গলা ব্যথ্যা বা খোসপাঁচড়ার দ্রুত চিকিৎসা করা, নেফ্রাইটিস হলে বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারলে কিডনি বেঁচে যাবে।
কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হলে ধীরে ধীরে কিডনি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। আক্রান্ত হয়ে গেলে সাধারণত চিকিৎসা করে সম্পূর্ণ নিরাময় করা যায় না, তবে ক্ষয়ের গতি কমিয়ে আনা যায়। শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ জন্মগত ত্রুটি, বংশগত কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিলে হয়ে থাকে।
বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রতিদিনের অভ্যাস ও জীবন প্রণালীর কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে ৫০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনিসহ অন্যান্য রোগও প্রতিরোধ করা সম্ভব। এগুলো চর্চার মাধ্যমে আমরা কর্মক্ষম সুস্থ ও দীর্ঘায়ু হতে পারি। কায়িক পরিশ্রম, খেলাধুলা ও নিয়মিত ব্যায়াম করা, ধূমপান থেকে বিরত থাকা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ফাস্টফুড এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ, যাতে পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফলমূল থাকবে, পর্যাপ্ত পানি পান করা, উচ্চ রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করা, খোসপাঁচড়া ও গলা ব্যথায় তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করা, খাবারের আগে হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিছন্ন জীবনযাপন, সুস্থ বিনোদন ও মন প্রফুল্ল রাখার মাধ্যমে কিডনি ভালো রাখা যায়।
কিডনি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রলজি (আইএসএন) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কিডনি ফাউন্ডেশন (আএফআইকে) যৌথভাবে প্রতি বছরের মার্চের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব কিডনি দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়।



