নানামুখী সঙ্কটে পড়েছে হজ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে হজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিভিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগ নিলেও সৌদি আরবের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বেসরকারি এজেন্সি মালিকরা বলছেন-এসব সঙ্কট আগে থেকেই সমাধান করতে না পারলে এবার দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়তে পারে।
সৌদি সরকার প্রতি বছর বাংলাদেশকে এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রীর কোটা দিলেও গত কয়েক বছর ধরে সে কোটা পূরণ হচ্ছে না। বরং খরচ বেড়ে যাওয়ায় হজযাত্রীর সংখ্যা প্রতি বছর কমে যাচ্ছে। এজেন্সি মালিকরা বলছেন প্রতি বছর নানা নিয়মকানুনের কথা বলে সৌদি সরকার হজের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণে অনেকে হজে যাওয়ার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ওমরাহ পালন করেই সন্তুষ্ট থাকছেন। অন্য দিকে ফরজ ইবাদত পবিত্র হজ পালন করতে গিয়েও প্রতি বছর দেশে ও সৌদিতে নানা হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন হজযাত্রীরা। লিড এজেন্সি : প্রতি বছর হজের কোটার প্রায় ৯৫ ভাগ যাত্রী বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে যায়। দেশের আট শতাধিক এজেন্সি এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এতদিন এসব এজেন্সি এককভাবে স্বাধীনভাবে হজ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও গত দুই বছর ধরে লিড এজেন্সির নামে এক নতুন ব্যবস্থাপনা শুরু হয়েছে। গত বছরের হজে ৭০টি লিড এজেন্সির মাধ্যমে অন্যান্য এজেন্সি হজযাত্রী পাঠায়। আর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হজে মাত্র ৩০টি লিড এজেন্সির অধীনে চলে যায় সব এজেন্সি। ২৫/৩০টি এজেন্সির হাজী এক জায়গায় আসায় তাদের সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে অনেক সময় হাজীরা কোনো সমস্যায় পড়লে সমাধান পেতে অনেক সময় চলে যাচ্ছে, অনেকে সমাধান পাচ্ছেনও না। আগামী হজেও ৩০ লিড এজেন্সি নির্ধারণ নিয়ে ইতোমধ্যে এজেন্সি মালিকদের মধ্যে বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে একটি সভাও করেছেন একটি পক্ষ। এ লিড এজেন্সি নিয়ে আগামী মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের মতো আরেকটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খাবার সরবরাহ : সৌদি আরবে সরকারি মাধ্যমের হাজীরা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় খাবার খেয়ে থাকেন। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়া হাজীদের এজেন্সি মালিকরা খাবার সরবরাহ করেন। বেসরকারি এজেন্সি মালিকদের খাবার সরবরাহ নিয়ে একসময় অনেক অভিযোগ ছিল। তবে সাম্প্রতিককালে এটি কিছুটা কমেছে। তবে এজেন্সি মালিকরা জানিয়েছেন, হজে মিনায় দীর্ঘদিন থেকে সৌদির মোয়াল্লেমরা খাবার সরবরাহ করেন। ওই খাবার খেয়ে হাজীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু দোষ হয় বাংলাদেশের নিয়ে যাওয়া এজেন্সি মালিকদের। সৌদি সরকার এ বছর নিয়ম করেছে-আগামী হজে হজের পুরো সময় অর্থাৎ ৩৫ থেকে ৪০ দিনই হাজীদের খাবার সরবরাহ করবে সৌদি কোম্পানি। বেসরকারি এজেন্সি আবাবিল হজ গ্রুপের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ বলেন, আগে মাত্র ৫ দিনের খাবার খেয়েই যেখানে হাজীরা অসুস্থ হয়ে পড়তেন সেখানে পুরো মাসজুড়ে তাদের দেয়া খাবার খেলে হাজীদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হজ এজেন্সি মালিকদের সংগঠন হাবের মহাসচিব ফরিদ আহমদ মজমুদার বলেন, বাংলাদেশের মানুষের খাবারের যে রুচি সৌদি কোম্পানি সেটি বুঝবে না। ফলে এবার এ নিয়ে ভয়াবহ একটি সঙ্কটের আশঙ্কা করছেন তিনি। বিষয়টি সরকারকে আগেভাগেই সৌদি সরকারের সাথে আলোচনা করে সমাধান করার আহ্বান জানান তিনি।
বিমান ভাড়া : প্রতি বছর ৯ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ এই পাঁচ দিন মাত্র হজের কার্যক্রম করতে হয়। এর বাইরে মদিনা নগরীতে রাসূল সা: এর রওজা জিয়ারত করে থাকেন হাজীরা। এর জন্য আরো পাঁচ দিন এবং যাওয়া-আসা দিয়ে আরো পাঁচ দিন অর্থাৎ মোট ১৫ দিন হলে খুব ভালোভাবে পবিত্র হজের কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজীদের মক্কা-মদিনায় ৩৫ থেকে ৪০ দিন থাকতে হয়। ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া থেকে যাওয়া হজযাত্রীরা এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ দিন মক্কা-মদিনায় থাকেন। বাংলাদেশী হাজীদের এতদিন বেশি থাকার কারণে হোটেল ভাড়া, খাবার খরচসহ আরো অনেক বিষয়ে অতিরিক্ত খরচের ঘানি টানতে হয়। শুধু বিমানের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতার অভাবে হাজীদের সৌদিতে বেশি দিন থাকতে হচ্ছে। এতে হাজীপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ বেশি হচ্ছে। ৭৫ হাজার হাজী হলেও এই খরচ বেশি হচ্ছে প্রায় ৭৫ থেকে ৯০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ওমরাহর যাত্রীদের বিমান টিকিটের মূল্য ৬৫ থেকে ৮৫ হাজার টাকা হলেও হজের সময় এ টিকেটের মূল্য ধরা হয় দ্বিগুণ-তিনগুণ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হজে সর্বোচ্চ বিমান ভাড়া উঠেছিল এক লাখ ৯৮ হাজার টাকা। পরে ধারাবাহিকভাবে কমে আগামী হজের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা।
এ বছর ইউএস বাংলা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিল তারা হাজীদের মাত্র ৯৮ হাজার টাকায় বহন করতে চায়। কিন্তু তাদের সে সুযোগ দেয়া হয়নি। ইউএস বাংলার মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানান, তারা হিসাব করেই বিমান ভাড়ার এ খরচ ধরেছেন। ফলে হজে বিমান ভাড়া এক লাখ টাকার মধ্যে রাখলে এখানে হাজীদের আরো ৩০ হাজার টাকার মতো সাশ্রয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এজেন্সি মালিকরা জানিয়েছেন, সাউদিয়াও এ রকম এক লাখ টাকা ভাড়া রাখতে রাজি আছে। কিন্তু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের কারণে প্রতি বছর হাজীদের বিপুল অঙ্কের টাকা শুধু বিমান পরিবহন খাতেই ব্যয় করতে হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়জার সোহেল আহমেদ বৃহস্পতিবার হজ মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, তাদের ব্যবস্থাপনার কাজে খরচ অনেক হওয়ার কারণে বিমান ভাড়া বেশি রাখছেন তারা। বেসরকারি এজেন্সি মালিকরা বলছেন, বিমান সারা বছর ব্যবসায় লস করে। আর তারা হজের মৌসুম আসলে হাজীদের কাছ থেকে এটি পুষিয়ে নিচ্ছে। তাদের ব্যর্থতার দায় মেটাতে হচ্ছে হাজীদের। কোবা হজ গ্রুপের মালিক মাওলানা মাহমুদুর রহমান বলেন, ইউএস বাংলা ভাড়া কম রাখার প্রস্তাব দিলেও তা রাখা হয়নি কেন? তারা যদি কমে পারে তাহলে অন্যরা পারবে না কেন? বিমান বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের কারণে সাউদিয়াকেও বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এতে হাজীদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। বিষয়টি সরকারের দেখা উচিত।
সৌদিতে এয়ারপোর্ট চার্জ : একইভাবে হাজীদের সৌদিতে এয়ারপোর্ট চার্জ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। বিমান প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, সৌদির এয়ারপোর্ট চার্জ বাবদই আমাদের হাজীপ্রতি খরচ হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। ফলে এখাতেও দেশের হাজীদের প্রায় ৯০ কোটি টাকা বেশি চলে যাচ্ছে। এ খাতের খরচ কমাতে সৌদির সাথে আলাপ চলছে বলে প্রতিমন্ত্রী জানান।
ক্যাটাগরি পরিবর্তন : সৌদি সরকার প্রতি বছর হজ আসলেই নতুন নতুন নিয়ম চালু করে। বাংলাদেশের হাজীরা প্রতি বছর ডি ক্যাটাগরির সুবিধা নিয়ে হজে গিয়ে থাকেন। এতে হাজীদের খরচ কিছুটা কম পড়ে। কিন্তু সৌদি সরকার ডি ক্যাটাগরি তুলে দিয়েছে। ফলে হাজীদের কমপক্ষে সি ক্যাটাগরির সুবিধা নিতে হবে। এতে মিনা-আরাফায় তাঁবু বাবদ হজের খরচ বেশি পড়বে।
অনুমোদনবিহীন এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগী : গত হজে অনুমোদন না থাকা কয়েকটি এজেন্সিও বিভিন্নভাবে হজযাত্রী পাঠিয়েছে। এ কারণে অনেক হাজীকে সৌদিতে বিপাকে পড়তে হয়। এ বছরও সে ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। এজন্য ধর্মমন্ত্রণালয় থেকে হাজীদের সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, অনুমোদনবিহীন এজেন্সি বা গ্রুপ বা কাফেলা নামীয় কিছু প্রতিষ্ঠান ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আকর্ষণীয় হজ প্যাকেজ ঘোষণা করে পবিত্র হজে গমন ইচ্ছুকদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে। প্রকৃতপক্ষে সরকার অনুমোদিত বৈধ লাইসেন্সধারী ও তালিকাভুক্ত যোগ্য হজ এজেন্সি ছাড়া অন্য কোনো এজেন্সি বা এজেন্ট বা গ্রুপ বা কাফেলার হজ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই এবং তাদের মাধ্যমে হজে গমন সম্ভব নয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত যোগ্য হজ এজেন্সি ব্যতীত অন্য কোনো এজেন্সি বা ট্রাভেল এজেন্ট বা গ্রুপ বা কাফেলার সাথে হজ সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সবাইকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
হাবের সভাপতি সৈয়দ গোলাম সরওয়ার বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এজেন্সি মালিকদের দুর্নাম হয়। এজন্য আমরা সব সময় হজযাত্রীদের সরাসরি এজেন্সির অফিসে এসে নিবন্ধনসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে বলি। তাহলে তারা কোনো সমস্যায় পড়লে আমরা ওই এজেন্সির সাথে কথা বলে সমাধান করতে পারি। ধর্ম মন্ত্রণালয়ও তখন ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু অনেকেই না বুঝে মধ্যস্বত্বভোগীদের পাল্লায় পড়েন।



