জামায়াতের নৈতিকতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা সংস্কারের রোডম্যাপ

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

শিক্ষিত বেকার তৈরির প্রচলিত ধারার অবসান ঘটিয়ে নৈতিকতা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত দলটির ইশতেহারে শিক্ষা খাতকে অন্যতম প্রধান সংস্কারক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ইশতেহারে বলা হয়েছে, শিক্ষা কেবল সনদ অর্জনের প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন ও বাস্তব জীবনের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করার মাধ্যম। সে লক্ষ্যেই প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে জামায়াত।

দলটির মতে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জামায়াত কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও প্রযুক্তি খাতের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা হবে, যাতে পড়াশোনা শেষে তরুণরা চাকরির পেছনে না ছুটে, নিজেরাই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করে।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক পলিসি সামিটে জামায়াত নেতারা জানান, শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে আনা, অপরিকল্পিত শিক্ষা সম্প্রসারণ বন্ধ করা এবং গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। একই সাথে কারিগরি, আইটি ও উদ্যোক্তা শিক্ষাকে মূলধারায় আনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষা সংস্কারে ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়কে জামায়াত তাদের মূল দর্শন হিসেবে তুলে ধরেছে। দলটির মতে, কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক নৈতিক শিক্ষা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক গবেষণায় দক্ষতা অর্জনও অপরিহার্য। এ কারণে কারিকুলাম পুনর্গঠন করে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনার কথা বলা হয়েছে।

কওমি মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও স্বীকৃতিও জামায়াতের প্রতিশ্রুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে কেবল কওমি মাদরাসার উচ্চতর পর্যায়ের কিছু সনদের স্বীকৃতি থাকলেও প্রাথমিক ও মধ্যম স্তরের সনদগুলো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। জামায়াত ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে কওমি মাদরাসার সর্বস্তরের সনদের স্বীকৃতি দেয়া হবে এবং মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে এর সমন্বয় ঘটানো হবে।

ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও দলটি বহুমুখী দক্ষতার ওপর জোর দিয়েছে। ইশতেহারে বাংলা ভাষার পাশাপাশি আরবি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনকে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুবসমাজ প্রসঙ্গে জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট- বেকারভাতা নয়, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরশীলতা। আমিরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘বেকারত্ব জাতির জন্য অভিশাপ। জামায়াতে ইসলামী যুবসমাজকে ভাতাভোগী নয়, দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে গড়ে তুলবে।’

নারী ও শিশু অধিকার বিষয়েও আলাদা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় শহরে ইভিনিং বাস সার্ভিস চালু, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা : শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে তরুণদের সহায়তায় একগুচ্ছ উদ্যোগের কথা জানিয়েছে রাজনৈতিক দলটি। ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্র্যাজুয়েশন শেষে চাকরি না পাওয়া শিক্ষিত তরুণদের জন্য সুদমুক্ত আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। পরিকল্পনার আওতায় চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদে পাঁচ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) দেয়া হবে।

এ ছাড়া মেধা ও আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক সুযোগ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে প্রতি বছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেয়া হবে। এর মাধ্যমে গরিব পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড ও ক্যাম্ব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে বলে জানানো হয়েছে।

নারী শিক্ষার প্রসারে ইডেন কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ ও হোম ইকোনোমিক্স কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বড় কলেজগুলোকে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে। সবধরনের সরকারি নিয়োগ সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক হবে বলেও ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।