নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে অস্থিরতার শীর্ষে। এই বিষয়টি আলজাজিরা ইনসাইড স্টোরির বিশেষ আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নির্বাচনের বিকল্প নেই। তারা বলেন, প্রতিটি দেশকেই বিপ্লবের পর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং বাংলাদেশ সেই পথ অতিক্রম করছে। আরব বসন্তের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, এই শতাব্দীর বিপ্লব সংস্কারধর্মী এবং রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যদি ভেঙ্গে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করা না হয়, তবে স্বৈরাচারী শাসন পুনরায় ফিরে আসার শঙ্কা রয়েছে।
ইনসাইড স্টোরির উপস্থাপক ছিলেন ডারিন আবুগাইদা, যিনি অনুষ্ঠানের শুরুতে বলেন, ‘ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যার পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর ছাত্রজনতার আন্দোলনই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। হত্যাকারী ভারতে পালিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকারের নির্বাচন হওয়ার কথা। তাই প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা অস্থির এবং কতটা ভঙ্গুর?’ তিনি আরো যোগ করেন যে, ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পরও শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং তার কর্মীরা তৎপর। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন- এই সবকিছুর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিপ্লবের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
হাদির হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রভাব : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়নের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, ‘শরীফ হাদির হত্যাকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলেও এটি কি বড় রাজনৈতিক ঝড় বয়ে আনবে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে সংবাদপত্রের অফিসে অগ্নিসংযোগসহ বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে, ফলে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে।’ তিনি আরো জানান, হাদির মৃত্যুর পর ইনকিলাব মঞ্চের অন্যান্য নেতাদের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ পেয়েছে। হাদিকে শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সহিংসতা এড়িয়ে চলা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অধ্যাপক শাহান বলেন, ‘নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তবে উদ্বেগ রয়েছে, বর্তমান সরকার কি সত্যিকারভাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কি না। নির্বাচন হয়ে গেলে এবং জুলাই সনদের অনুসারে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে পারে। কিন্তু নির্বাচন যদি সহিংস ও সংঘর্ষময় হয়, তাহলে সঙ্কট সৃষ্টি হবে এবং পরবর্তী সরকার কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হবে।’
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব : বাংলাদেশ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনীতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। গত সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে গণতান্ত্রিক কাঠামোর অভাব অর্থনীতিকে ইনক্লুসিভ করতে ব্যর্থ করেছে। কর্মসংস্থান সংকুচিত ছিল, সরকারি খাতেও কোটা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণশীল ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে অর্থনীতি পর্যাপ্ত উন্নয়ন দেখতে পাইনি। প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত মানের নিচে, তরুণদের কর্মসংস্থান সীমিত, বিদেশী বিনিয়োগও নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। নির্বাচিত সরকারই তরুণদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করে আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারবে।’
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও আরব বসন্তের শিক্ষা : অধ্যাপক শাহান আরব বসন্তের সাথে বাংলাদেশের বিপ্লব তুলনা করে বলেন, ‘মিসরের গণ-অভ্যুত্থান মূলত গণতান্ত্রিক সংস্কারধর্মী আন্দোলন হলেও রাজনৈতিক দলের সমঝোতার অভাবের কারণে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসে। তিউনিসিয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন; রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজন করে সংবিধান সংশোধন করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের এখান থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত- নির্বাচন হলো জুলাই আন্দোলনের পর সংস্কারের বাস্তবায়নের একটি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তা করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারে আপস করলে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হবে। নির্বাচিত রাজনৈতিক দলগুলো যদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্ষম করতে সমঝোতায় এগোতে পারে, তাহলে স্বৈরাচারী শাসন অচিরেই অবসান ঘটাতে পারবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হলে, ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসন ফেরত আসার সম্ভাবনা থাকবে।’
স্বকীয়তা, তরুণ জনগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ : অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ল্যারেন্ডন স্কলার তাকবির হুদা বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিচয় সঙ্কটে ভুগছে। ছাত্রজনতার আন্দোলন, বিশেষ করে মাদরাসা ছাত্রদের অংশগ্রহণ, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সংস্কারধর্মী শক্তি হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে। ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক অনুসারীদের সংঘাত দূর করা জরুরি।’
তিনি আরো বলেন, ‘তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ভোট দিতে পারে। তবে নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত। নির্বাচিত সরকার যদি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তারা যুবসমাজকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।’
আলজাজিরা ইনসাইড স্টোরির আলোচনায় প্রতিটি বিশেষজ্ঞ একমত যে
ক্স বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্বাচনের সুষ্ঠু আয়োজন এবং প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে।
ক্স জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য- সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার- বাস্তবায়ন করা না হলে স্বৈরাচারী শাসন পুনরায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্স তরুণ জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর ভূমিকা দেশের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তবে যেকোনো ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক সংঘর্ষ ভবিষ্যতে বিপর্যয় ঘটাতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এবং স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাংলাদেশের বিপ্লবী অর্জন স্থায়ী হবে না।



