ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নতুন চ্যালেঞ্জ কাঁচামাল ও ঋণপ্রাপ্তি

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) দীর্ঘদিন ধরে জিডিপি, রফতানি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের কঠোর শর্ত এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে এ খাতটি নতুন ধরনের চাপে পড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইনের অনিশ্চয়তা এবং বাজারের অস্থিরতার সাথে মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেক এসএমই উদ্যোক্তা দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা ও ব্যবসা সম্প্রসারণে জটিলতার মুখে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান না হলে দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈদেশিক বাজারের সাথে সংযোগের কারণে অতীতে এসএমই খাত তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে উদ্যোক্তারা উচ্চ উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এ খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে। জ্বালানি ব্যয়, রফতানি উপকরণ, কেমিক্যাল এবং ধাতব কাঁচামালের দাম গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ঢাকার ধানমন্ডিতে একটি কারখানার মালিক মো: রফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, গত ছয় মাসে তাদের কাঁচামালের খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, এই অতিরিক্ত খরচ সরাসরি ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, এসএমই খাতে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি শুধু আর্থিক চাপই তৈরি করে না, বরং পুরো উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি বাজারমূল্যে পড়ে। এতে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যেতে পারে এবং ছোট ব্যবসায়ীরা বিক্রি হারাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি আরো বলেন, এসএমই খাতকে টেকসই রাখতে কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, সাশ্রয়ী ঋণ সুবিধা প্রদান, প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর নীতি প্রণয়ন জরুরি। প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে ছোট ব্যবসাগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ চেইনের অনিশ্চয়তাও এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশী সরবরাহকারীদের সাথে যোগাযোগের জটিলতা এবং শিপিং খরচ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রামের একজন গার্মেন্ট উদ্যোক্তা জানান, বিদেশ থেকে কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে তারা সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের ক্রেডিট রেটিংও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ দিকে বাজারের অস্থিরতাও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ধাক্কায় ক্রেতাদের চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তার রফতানি আয় গত এক বছরে কমেছে।

বগুড়ার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা জাহিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, তারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে পণ্য রফতানি করেন। সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ওই অঞ্চলে অর্ডার কমে গেছে। এতে তাদের ব্যবসা সীমিত হয়ে পড়েছে এবং কারখানার দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসএমই খাত টিকিয়ে রাখতে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমানে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদের হার আরোপ করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের একজন ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা আরিফুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা সম্প্রতি একটি নতুন প্রকল্প শুরু করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যাংক ঋণ দেয়নি। সুদের হার অনেক বেশি এবং শর্তও কঠোর। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে হয়েছে।

তিনি বলেন, এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী ঋণ ব্যবস্থা না থাকলে ব্যবসা সম্প্রসারণ থমকে যাবে। ছোট উদ্যোক্তারা নিজেদের মূলধন দিয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও সীমিত করে দিতে পারে।

অন্য দিকে ডিজিটালাইজেশনেও অনেক এসএমই উদ্যোক্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। কম্পিউটার, সফটওয়্যার এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের খরচ অনেক ছোট ব্যবসায়ীর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল সক্ষমতা ছাড়া এসএমই খাত বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

বিশ্ব অর্থনীতিতে অনলাইন ও ই-কমার্সের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। প্রযুক্তি গ্রহণে পিছিয়ে পড়লে এসএমই উদ্যোক্তারা রফতানি ও আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

এ দিকে সরকার এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সহজ ঋণ, কর সুবিধা, প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এখনও কিছু ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় এসব সহায়তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাস্তবে উদ্যোক্তারা তা পেতে সমস্যায় পড়েন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য স্বচ্ছ ও দ্রুত সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

এ ছাড়া স্থানীয় বাজারেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এবং বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আগমনে তাদের বাজারের অংশ কমছে। বড় ব্র্যান্ডগুলো অনলাইন ও আউটলেটে বিভিন্ন অফার দিয়ে বিক্রি বাড়াচ্ছে, যা ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে দেয়া সম্ভব হয় না। ফলে অনেক ক্রেতা বড় ব্র্যান্ডের দিকে ঝুঁকছেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, কিছু এসএমই উদ্যোক্তা নতুন উদ্যোগ নিচ্ছেন। তারা বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছেন, উৎপাদন খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যে পরিবর্তন আনছেন।

ঢাকার মিরপুরে একটি ক্ষুদ্র হ্যান্ডিক্রাফট প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ কামাল নয়া দিগন্তকে বলেন, তারা বিদেশী বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন ডিজাইন তৈরি করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন। তার মতে, এভাবে পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে ছোট ব্যবসাও টেকসই রাখা সম্ভব।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বাজারের অস্থিরতা, ঋণসঙ্কট এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে এ খাত নতুন চাপের মুখে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের নিজস্ব উদ্যোগ এবং সরকারের কার্যকর সহায়তা ছাড়া এসএমই খাতের জন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।