দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সঙ্কট দীর্ঘ দিনের। তবে এই সঙ্কট উত্তরণে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবায়নেও সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় সাড়ে বারো হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে শূন্য পদের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রধান শিক্ষক সঙ্কট এবং ডিজিটাল বদলি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক বিদ্যালয়ে একজন বা দু’জন শিক্ষক দিয়ে কয়েকশ’ শিক্ষার্থীর পাঠদানও চলছে। আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক থাকলেও অন্য এলাকায় শিক্ষকশূন্য অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষক কর্মরত। কিন্তু অবসর, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন কারণে ৭৩ হাজারের বেশি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক পদে সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক ও শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনাও ব্যাহত হচ্ছে।
গ্রামে শিক্ষক সঙ্কট, শহরে তুলনামূলক স্বস্তি
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয়গুলোতেই শিক্ষক সঙ্কট বেশি। অনেক বিদ্যালয়ে পাঁচটি শ্রেণীর জন্য মাত্র দুই বা তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। ফলে এক শিক্ষককে একাধিক শ্রেণীর পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অবশ্য এ বিষয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষকদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত না হলে শুধু নতুন নিয়োগ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
উদ্যোগ থাকলেও বদলিতে অসন্তোষ
শিক্ষক সঙ্কটের পাশাপাশি সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে বদলি ব্যবস্থা। কয়েক বছর আগে চালু হওয়া ডিজিটাল বদলি পদ্ধতি শিক্ষক বদলিতে স্বচ্ছতা আনলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এর নানা সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্বীকার করেছেন, বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থা স্থানীয় বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, অনেক শিক্ষক নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বদলি হতে চান, ফলে কোনো কোনো এলাকায় শিক্ষক সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে অনেক উপজেলা ও গ্রামীণ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সঙ্কট থেকেই যাচ্ছে। সরকার এ কারণে বিদ্যমান ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
বদলিতে আসছে নতুন নিয়ম
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বদলি প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকৃত নতুন ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন নীতিমালার আওতায় উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে শিক্ষক বদলি একটি ‘সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির ক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত ছিল। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই অনিয়ম কমিয়ে শিক্ষকদের প্রয়োজনভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে স্থানীয় চাহিদা বিবেচনায় এনে শিক্ষক বদলি করা সহজ হবে।
বদলি সংক্রান্ত কমিটি গঠন
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে একজন সহকারী শিক্ষক বদলির জন্য উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সদস্য তালিকাসহ চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়নি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কমিটিগুলোর কাঠামোর একটি খসড়ায় যেভাবে কমিটির গঠন দেখানো হয়েছে তা হলো- (এক) উপজেলা পর্যায়ের বদলি কমিটি (৪ সদস্য) : উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সভাপতি থাকবেন। এরপর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ইউপিইও) সদস্যসচিব ও বদলি আদেশ বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সাথে অন্যান্য আরো দুই সদস্য থাকবেন যা, প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত হবে (এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হয়নি)। (দুই) জেলাপর্যায়ের বদলি কমিটি ( ৫ থেকে ৬ সদস্য) : জেলা প্রশাসক (ডিসি) সভাপতি থাকবেন। এ ছাড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সদস্য থাকবেন। এর মধ্যে একজন সদস্যসচিব থাকবেন, যিনি আবেদন যাচাই ও কার্যক্রম সমন্বয় করবেন।
(তিন) বিভাগীয় পর্যায়ের বদলি কমিটি (৫ থেকে ৬ সদস্য) : বিভাগীয় কমিশনার থাকবেন সভাপতি বিভাগীয় উপপরিচালক (প্রাথমিক শিক্ষা) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সদস্য থাকবেন। এ ছাড়া একজন সদস্যসচিব থাকবেন। (চার) সিটি করপোরেশন পর্যায়ের কমিটি : প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হবেন সভাপতি। ৫ থেকে ৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি আবেদন যাচাই ও নিষ্পত্তি করবে।
প্রধান শিক্ষক সঙ্কটে বাড়ছে সমস্যা
বেশ কয়েকজন শিক্ষক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন শুধু সহকারী শিক্ষক নয়, প্রধান শিক্ষক পদেও দীর্ঘদিন ধরে শূন্যতা রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষকদের তদারকি, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয়ভাবে অভিভাবকদের সাথে সমন্বয় ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান শিক্ষক পদে দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা প্রাথমিক শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে সরকার ইতোমধ্যে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার আশ্বাস দিয়েছে। অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া হলে শিক্ষক সঙ্কট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নিয়োগ নয়, বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক চাহিদার সঠিক মূল্যায়নও খুব জরুরি। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক থাকলেও অন্য বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এ ধরনের অসম বণ্টন শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শিক্ষকদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ
সরকারের সাম্প্রতিকালের নানা উদ্যোগের ফলে দেখা গেছে শুধু বদলি নয়, পদোন্নতি, বেতন গ্রেড এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যেও চরমভাবে অসন্তোষ বাড়ছে। একই সাথে বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষক সংগঠনগুলো আন্দোলন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। প্রায় চার লাখ শিক্ষককে ঘিরে এই অসন্তোষ শিক্ষা কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে শিক্ষক সঙ্কট নিরসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের মতে দীর্ঘদিনের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে। প্রধান শিক্ষক নিয়োগেও গতি আনতে হবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বদলি ব্যবস্থায় নতুন সংস্কার এবং শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম জোরদারের কথা বললেও বাস্তবে কত দ্রুত এর সুফল মিলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ শিক্ষক সঙ্কট, প্রধান শিক্ষক পদে শূন্যতা এবং অসম বণ্টনের সমস্যা দীর্ঘদিনের। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন নিয়োগ ও বদলি সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের সরকারি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে দেশের লাখো কোমলমতি শিক্ষার্থী।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের বিধান থাকলেও আদালতে চলমান মামলার কারণে পদোন্নতি কার্যক্রম আটকে রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ সঙ্কটের সমাধান হচ্ছে না।
কোথায় বেশি সঙ্কট
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক উপজেলায় শিক্ষক সঙ্কট তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওর ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে একজন বা দু’জন শিক্ষক দিয়ে পাঁচটি শ্রেণীর পাঠদান চালিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটছে। অন্য দিকে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরসংলগ্ন অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা বেশি। ফলে একই ব্যবস্থার মধ্যে এক দিকে শিক্ষক উদ্বৃত্ত, অন্য দিকে শিক্ষক ঘাটতির মতো বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
বদলি ব্যবস্থায় ভোগান্তি
শিক্ষকদের অভিযোগ, ডিজিটাল বদলিব্যবস্থা চালু হওয়ার পর স্বচ্ছতা কিছুটা বাড়লেও কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায়নি। অনেক শিক্ষক পারিবারিক, স্বাস্থ্যগত বা মানবিক কারণে বদলির আবেদন করেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন। কুমিল্লার এক সহকারী শিক্ষক মো: রবিউল ইসলাম জানান, স্বামী-স্ত্রী দু’জনই আমরা সরকারি চাকরিজীবী। প্রায় আট বছর ধরে আলাদা জেলায় কর্মরত থাকলেও একাধিকবার আবেদন করেও আমরা নিজ জেলার কাছাকাছি বদলি হতে পারিনি। কুড়িগ্রামের এক নারীশিক্ষক বলেন, সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে রেখে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের বিদ্যালয়ে চাকরি করতে হচ্ছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ফল পাননি। অন্য দিকে শিক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, অধিকাংশ শিক্ষক শহর বা জেলা সদর এলাকায় যেতে চান। ফলে দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষক সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে।



