হুম্মাম কাদেরের জবানবন্দী

অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার আপনাকে একটা সেকেন্ড চান্স দিতে চান’ ২০১৭ সালের মার্চ মাসের এক ভোরে আয়নাঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এভাবেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশের কথা জানানো হয়েছিল হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে। দীর্ঘ সাত মাস গুম ও অমানবিক নির্যাতনের পর মুক্তি পাওয়ার ঠিক আগে তাকে এই বার্তা দিয়েছিলেন বন্দিশালার কর্মকর্তারা।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

  • বুঝতে পারি গুম ও নির্যাতনের পিছনে শেখ হাসিনার হাত আছে

  • হুম্মাম সেলের বাইরে হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন

  • আয়নাঘরে বন্দী অবস্থায় হিন্দিতে কথা বলতে শুনেছি

  • আমার সেলের টেবিলে লেখা ছিল সিটিআইবি

‘অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার আপনাকে একটা সেকেন্ড চান্স দিতে চান’ ২০১৭ সালের মার্চ মাসের এক ভোরে আয়নাঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এভাবেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশের কথা জানানো হয়েছিল হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে। দীর্ঘ সাত মাস গুম ও অমানবিক নির্যাতনের পর মুক্তি পাওয়ার ঠিক আগে তাকে এই বার্তা দিয়েছিলেন বন্দিশালার কর্মকর্তারা।

গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে দেয়া জবানবন্দীতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান হুম্মাম।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের দলীয় প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরী জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন, কেবল বিএনপির রাজনীতি করার কারণে এবং পারিবারিক পরিচয়ে তাকে দীর্ঘ সাত মাস জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি), যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত, সেখানে বন্দী রেখে বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে।

এর আগে সোমবার এই মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির বিচার শুরু হলো। সূচনা বক্তব্যের পর হুম্মামের সাক্ষ্যগ্রহণ (জবানবন্দী) শুরু হয়।

জবানবন্দীতে হুম্মাম বলেন, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট সকালে আমার ধানমন্ডির বাসা থেকে গাড়ি করে ঢাকা সিএমএম কোর্টের উদ্দেশে রওনা হই। গাড়িতে আমার সাথে আমার ব্যক্তিগত সিকিউরিটি মো: সায়েম, আমার ড্রাইভার এবং আমার আম্মা ছিলেন। যাওয়ার পথে একটি মোটরসাইকেল আমার গাড়ি ফলো করতে শুরু করে। বংশাল থানার সামনে ট্রাফিক সিগন্যালের কাছে আমার গাড়ি থামলে ৭-৮ জন সাধারণ পোশাকধারী ব্যক্তি আমার গাড়ি ঘেরাও করে। আমাকে গাড়ি থেকে বের হতে বললে আমি আমার মোবাইল ফোন ও ওয়ালেট আমার আম্মার হাতে দিয়ে গাড়ি থেকে বের হই। আমাকে জোর করে আমার দু’হাত ধরে হাঁটিয়ে বংশাল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আমাকে বংশাল থানার ওসি সাহেবের রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৫-২০ মিনিট পরে একই ব্যক্তিরা আমাকে নিচে নিয়ে যায়।

অতঃপর একটি মাইক্রোবাসে করে আমাকে ডিবি অফিস, মিন্টোরোডে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে নারকোটিক্স শাখার একজন অফিসারের রুমে রাখা হয়। সেখানে আমি টিভিতে দেখতে পাই যে, আমার মা কোর্ট রুমে প্রবেশ করছেন এবং আমার আইনজীবীরা প্রতিবাদ করছেন যে, আমাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করেছে। কিছুক্ষণ পরে টিভির খবরে দেখতে পাই যে, আমি কোর্টে উপস্থিত না হতে পারার কারণে আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আমি তখন চিৎকার করে প্রতিবাদ করি যে, ‘আমি আপনাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আমার বিরুদ্ধে কেন গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু হচ্ছে?’

বেশ কিছুক্ষণ পরে টিভিতে দেখতে পাই যে, হোলে আর্টিজান মামলার আসামিদের আদালতে উপস্থিত করা হচ্ছে। আমি সে খবর দেখে ভয় পেয়ে যাই। আমার সন্দেহ হয় যে, হয়তো এই মামলায় আমাকে জড়ানো হতে পারে। পরবর্তীতে ডিবির মিডিয়া শাখার পরিচালক মনির সাহেব একটি ব্রিফিং করেন এবং বলেন যে, তারা হুমাম কাদের চৌধুরীকে আটক করেননি। এই ব্রিফিংটিও আমি টিভিতে দেখতে পাই। আমি আবার প্রতিবাদ করলে তারা টিভি বন্ধ করে দেয়। তখন বিকেল আনুমানিক ৪ ঘটিকা। আমাকে রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে রাখা হয়। রাত ১০টার সময় আমাকে একজন ব্যক্তি প্রশ্ন করেন যে আমি কিছু খেয়েছি কি না। আমাকে বলা হয় আমি যা খেতে চাই তাই এনে দেয়া হবে। পরবর্তীতে আমার জন্য বিভিন্ন ধরনের খাবার নিয়ে আসা হয়। আমি সামান্য পরিমাণ রুটি খাই। আমাকে বলে ‘এখন আপনার যাওয়ার সময় হয়েছে।’

তখন রাত ১১টা বাজে। আমাকে বাইরে নিয়ে একটি ভাঙা মাইক্রোবাসে উঠানো হয়। আমার পিছনে দু’জন, আমার দুই পাশে দু’জন, সামনে একজন ব্যক্তি এবং একজন ড্রাইভার ছিলেন। গাড়ি মিন্টোরোড থেকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের দিকে যাত্রা শুরু করে। সামনে বসা লোকটি কাঁদছিলেন। তিনি আমার কাছে ক্ষমা চান। তখন আমি মনে করেছিলাম আমাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে যাওয়ার পর আমার পিছনে বসা ব্যক্তি আমাকে বলে, ‘আপনাকে ব্লাইন্ডফোল্ড করতে হবে।’ আমি কোনো প্রতিবাদ করিনি। আমাকে ব্লাইন্ডফোল্ড করা হয়। এ সময় গাড়ি মহাখালী ফ্লাইওভার অতিক্রম করতে থাকে। আমি বুঝতে পারি যে, আমরা এয়ারপোর্ট রোডে পৌঁছে গেছি। আমার পাশের ব্যক্তি ফোনে কাউকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, ‘আমরা পৌঁছে গেছি, আপনারা কোথায়?’ পরবর্তীতে বলে, ‘আপনাদেরকে দেখতে পেয়েছি, আমরা আসছি।’ গাড়িটি একটি কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়ে এবং থেমে যায়। আমাকে গাড়ি থেকে নামানো হয় এবং হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। আমাকে অন্য একটি গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা আমাকে অন্য একটি মাইক্রোবাসে উঠায় এবং আমাকে জমটুপি পরানো হয়। আমার কোমরে একটি অস্ত্রের স্পর্শ অনুভব করি। গাড়ি যাত্রা শুরু করে। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় আমি ভয় পাচ্ছি কি না। আমি কোনো জবাব দিইনি। হঠাৎ করে গাড়ি দুলতে থাকলে আমি বুঝতে পারি যে, হয়তো আমাকে ক্যান্টনমেন্টে নেয়া হচ্ছে; কারণ সেখানে জিগজ্যাগ করে রাস্তায় কোণ রাখা থাকে। কিছুক্ষণ গাড়ি চলার পর গাড়ি থেমে যায় এবং আমি গাড়ির হর্নের আওয়াজ শুনতে পাই। একটি পুরাতন গেট খোলার আওয়াজ শুনতে পাই। গাড়িটি ভিতরে প্রবেশ করার পর আমাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়।

আমাকে একটি দেয়ালের সাথে দাঁড় করিয়ে আমার বডি সার্চ করা হয়। জমটুপি একটু উপরে উঠানো হলে আমি নাক ও মুখে বাতাসের স্পর্শ অনুভব করি। মনে হচ্ছিল আমাকে কোনো কিছু স্প্রে করা হয়েছে। আমাকে ভিতরে একটি কামরায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি ছোট টুলের উপরে আমাকে বসানো হয়। তখন আমার মেডিক্যাল টেস্ট করা হয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় আমি কোনো ওষুধ ব্যবহার করি কি না। ব্লাডপ্রেশার মাপার পর আমার দু’হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দু’হাত পিছনে নিয়ে আবার হ্যান্ডকাফ পরানো হয়।

আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। প্রথমে আমার পরিচয় জানতে চায়। আমার রাজনৈতিক বিশ্বাস জানতে চায়। আমার পরিবারের কে কে জীবিত আছেন জানতে চায়। এরপর আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে, আমি আইএসআই , ‘র’ বা ‘সিআইএ’-এর সাথে যোগাযোগ করি কি না। আমি যোগাযোগের কথা অস্বীকার করলে আমাকে মারধর শুরু করে। মাথার পিছনে লাঠি দিয়ে বাড়ি দেয়া হয়। আমি টুল থেকে নিচে পড়ে যাই। আবার আমাকে টুলে বসানো হয় এবং মারধর করা হয়।

বেশ কিছুক্ষণ পর তারা আমাকে আরেকটি সেলে নিয়ে যায়। সেখানে আমার জমটুপি, ব্লাইন্ডফোল্ড এবং হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়া হয়। আমাকে একটি দেয়ালের সাথে ধাক্কা দিয়ে দাঁড় করিয়ে আমার কাপড়-চোপড় খুলতে বাধ্য করে এবং আমার ছবি তোলা হয়। আমি প্রতিবাদ করলে আমাকে বলা হয় এখানে অনেক জায়গা আছে আপনাকে ঝুলিয়ে রাখার। পরবর্তীতে তারা আমাকে একটি লুঙ্গি দিতে চাইলে আমি তাদেরকে বলি যে আমি লুঙ্গি পরি না। তারা আমার জন্য একটি পুরাতন টি-শার্ট এবং একটি ফ্ল্যানেল প্যান্ট এনে দেয়। তারা আমার ঘড়ি এবং কাপড়-চোপড় নিয়ে যায়। সেই সেলে আমাকে সাত মাস রাখা হয়।

সেলের ভিতরে একটি চৌকি, একটি অটবির টেবিল ও একটি প্লাস্টিক চেয়ার ছিল। পরদিন সকাল বেলা যখন আমাকে নাশতা দেয়া হয় তখন আমি সেই টেবিলে বসে রুটি এবং ডিম খাই। টেবিলের নিচের অংশে লাল কালি দিয়ে ‘সিটিআইবি’ লেখা দেখতে পাই। আমি তখন ‘সিটিআইবি’এর অর্থ জানতাম না। আমি অসুস্থ হয়ে যাই। আমার তখন ১০৩-১০৪ ডিগ্রি জ্বর হয়। একজন ব্যক্তি আমার সাথে দেখা করতে আসে এবং টেবিলের গায়ে ‘সিটিআইবি’ লেখা দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। টেবিলটি সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

তৃতীয় দিন আরেকজন সিনিয়র অফিসার আসেন। আমাকে ওই জ্বরের ঘোরেই ব্লাইন্ডফোল্ড করানো হয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় আমার কী হয়েছে, কেন হয়েছে। আমি তাকে জবাব দিই হয়তোবা ভয়ের কারণে আমার জ্বর হয়েছে। আমাকে বলা হয় ভয়ের কোনো কারণ নেই, আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আমাকে কোর্টে কবে নেয়া হবে জিজ্ঞাসা করলে সে কোনো জবাব দেয়নি।

আমাকে মাঝে মধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একই বিল্ডিংয়ের অন্য একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। এই স্থানটিই ছিল ইন্টারোগেশন সেল। সেখানে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে ব্লাইন্ডফোল্ড করা হতো, জমটুপি পরানো হতো এবং হ্যান্ডকাফ লাগানো হতো। বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও একইভাবে নিয়ে যাওয়া হতো।

নির্যাতনের কারণে আমার সারা শরীরে ক্ষতের মতো হয়ে যায়। আমার পায়ের অংশে একটি বড় ফোঁড়া হয়। আমি মনে করেছিলাম তারা হয়তো আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে এবং কেউ আমাকে দেখে চিনতে পারবে। বেশ কিছুদিন পর ফোঁড়ার কারণে যখন আমি হাঁটতে পারছিলাম না, আমি চিৎকার-চেঁচামেচি করে ডাক্তার ডাকতে বলি। তখন একজন ডাক্তার এসে আমাকে পরীক্ষা করেন। আমি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে তিনি বলেন একজন বড় ডাক্তার এসে চিকিৎসা করবেন।

আমার বিপরীত দিকের সেলে একজন বন্দীর কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ এবং খাবারের পর শব্দ করে ঢেকুর তোলার শব্দ প্রতিদিন শুনতে পেতাম। তার কান্নার আওয়াজও অনেক দিন শুনেছি। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর জানতে পারি যে, উপরোক্ত কুরআন তেলাওয়াতকারী লোকটির নাম ব্রিগেডিয়ার আমান আযমী। তখন আমি বুঝতে পারি যে, এই বিল্ডিংয়ে আমি একা নই, এখানে আরো বন্দী আছে। আমার সেলে দুই স্তরের দরজা ছিল। একটি লোহার বার এবং আরেকটি সম্পূর্ণ স্টিলের দরজা ছিল। একদিন স্টিলের দরজার কিছু অংশ ফাঁকা থাকায় একজন ব্যক্তিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখি। তাকে জমটুপি পরানো ছিল। তবে জমটুপির নিচে তার দাড়ি দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সে একজন বয়স্ক ব্যক্তি। অন্য একদিন আরেকজন আটক ব্যক্তিকে দেখতে পাই। তার ব্লাইন্ডফোল্ড করা ছিল। তার পরনে লুঙ্গি ছিল এবং তার লম্বা দাড়ি ছিল। তার বয়স অনেক কম ছিল। আমার সেলের ভিতরে একটি টিউব লাইট এবং একটি সিলিং ফ্যান ছিল। এই লাইটটি সব সময় অন থাকত, বন্ধ করার কোনো সুযোগ ছিল না; যা ছিল নির্যাতনের অংশ। একদিন আমাকে যখন ইন্টারোগেশন সেলে মারধর করা হচ্ছিল তখন আমার ব্লাইন্ডফোল্ডটি সরে গেলে দেখতে পাই যে রুমে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল সে রুমটি সম্পূর্ণভাবে সাউন্ডপ্রুফ ছিল। চারপাশের দেয়ালে খয়েরি রঙের ছোট ছোট ছিদ্র বিশিষ্ট কার্ডবোর্ডের মতো কভার দিয়ে ঢাকা ছিল। রুমটা প্রথমে অনেক বড় মনে হলেও ব্লাইন্ডফোল্ড খুলে যাওয়ার পর দেখলাম যে রুমটা অনেক ছোট।

ইন্টারোগেশন সেলে আমাকে যখন শেষবার নেয়া হয় তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে আমাকে যদি ছেড়ে দেয়া হয় তবে আমি সবাইকে কী বলব। আমি জবাবে বলেছিলাম আপনারা যা বলতে বলবেন তাই বলব। তারা আমাকে শিখিয়ে দিলো আমি যেন বলি কিছু দুষ্ট লোক আমাকে কিডন্যাপ করেছিল, আমি তাদের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি। আমাকে আরো বলা হয়, ‘অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার আপনাকে একটা সেকেন্ড চান্স দিতে চান।’ তখন আমি বুঝতে পারি যে, আমাকে গুম এবং নির্যাতনের ঘটনার পিছনে শেখ হাসিনার হাত আছে। সেই দিন আমাকে আমার সেলে ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়।

তিন দিন পর ভোররাতে কিছু লোক আমার সেলে প্রবেশ করে এবং আমাকে তিন স্তরে ব্লাইন্ডফোল্ড করা হয়। আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে সেল থেকে বের করে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়। অনেকক্ষণ গাড়ি চলার পর আবারো সেই জিগজ্যাগ অনুভব করতে পারি। আনুমানিক ২০ মিনিট গাড়ি চলার পর একজন ব্যক্তি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন আমি ভয় পাচ্ছি কি না। আমি বলি আমি ভয় পাচ্ছি না। তখন আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয় কেন ভয় পাচ্ছি না। জবাবে আমি বলেছিলাম, ‘যদি মেরে ফেলেন তাহলে আব্বার সাথে দেখা হবে, আর যদি ছেড়ে দেন তাহলে আম্মার সাথে দেখা হবে।’ অনেকক্ষণ গাড়ি চলার পর গাড়িটা থেমে যায় এবং আমাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। আমাকে ফুটপাথে বসিয়ে আমার হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়া হয়। তারা আমার ব্লাইন্ডফোল্ড খুলে দিতে দিতে বলে আমি যেন তিন মিনিট চোখ বন্ধ করে রাখি। যদি চোখ খুলি তাহলে সমস্যা হবে। তারপর গাড়িটির দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পাই এবং গাড়িটি চলে যায়। আমি চোখ খুলে গাড়িটিকে চলে যেতে দেখি। অনেকক্ষণ সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এলাকাটি চেনার চেষ্টা করি। এক পর্যায়ে বুঝতে পারি আমি ধানমন্ডি ৭/এ এলাকায় আছি, যেটা আমার বাসা থেকে তিন রাস্তা দূরে। আমি হেঁটে হেঁটে বাসার দিকে যেতে থাকি। দূর থেকে দেখি উল্টো দিক থেকে কিছু মানুষ আমার দিকে হেঁটে আসছে। আমি তাদেরকে দেখে ভয় পেয়ে যাই; কারণ আমি ভেবেছিলাম তারা আমাকে হত্যা করতে আসছে। তারা কাছে আসলে বুঝতে পারি যে তারা দিনমজুর। বাসায় ঢুকতে গেলে বাসার গার্ড আমাকে ঢুকতে দেয়নি কারণ সে আমাকে চিনতে পারছিল না। আমার ওজন অনেক কমে যাওয়া, দাড়ি এবং চুল অনেক লম্বা হয়ে যাওয়ায় সে আমাকে চিনতে পারেনি। আমার বাড়িতে থাকা পোষা কুকুর আমাকে চিনতে পেরেছিল, বিধায় দারোয়ান গেট খুলে দেয়। বাড়িতে প্রবেশ করে জানতে পারি আমার আম্মা এই বাসায় থাকেন না। তিনি গুলশানে আমার বড় ভাইয়ের বাসায় তার সাথে থাকেন।

আমি গাড়িতে করে গুলশানে আমার বড় ভাইয়ের বাসায় যাই। আম্মার সাথে দেখা হওয়ার পর জানতে পারি আরো দুইজন, মীর আরমান এবং ব্রিগেডিয়ার আজমিকেও গুম করা হয়েছে। তাদেরকে আমি দেখেছি কি না তা আমার আম্মা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন। আমি বলি আমার ওখানে কাউকে দেখার সুযোগ হয়নি।

পরবর্তীতে জানতে পারি আমাকে আটক করার সময় সিটিআইবি-এর ডিরেক্টর ছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। ডিজিএফআই-এর প্রধান ছিলেন জেনারেল আকবর। আমাকে যখন মুক্তি দেয়া হয় তখন ডিজিএফআই-এর প্রধান ছিলেন জেনারেল আবেদিন।

৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরে প্রধান উপদেষ্টার সাথে আমার আয়নাঘর (যেখানে আমাকে গুম করে রাখা হয়েছিল) পরিদর্শন করার সুযোগ হয়েছিল। সাংবাদিক তাসনিম খলিলের একটি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে জানতে পারি ওই বিল্ডিংটার কোড নেম ‘আয়নাঘর’, তবে প্রাতিষ্ঠানিক নাম জেআইসি (জেআইসি)। প্রধান উপদেষ্টার সাথে পরিদর্শনের সময় আমাকে যে সেলে আটক রাখা হয়েছিল সে সেলটি চিহ্নিত করতে পারি; কারণ তখনও সেখানে আমার ইনিশিয়াল ও অপহরণের তারিখ লেখা ছিল, যা আমি লিখেছিলাম। আমাকে মুক্তি দেয়া হয় ২০১৭ সালের মার্চ মাসের ২ তারিখে।

যারা আমাকে গুম করেছিল, গুমের নির্দেশ দিয়েছিল, আয়নাঘরে আটকে রেখেছিল, নির্যাতন করেছিল আমি তাদের বিচার চাই। শেখ হাসিনা, জেনারেল আকবর, জেনারেল আবেদিন, ব্রিগেডিয়ার তৌহিদুল ইসলাম এবং তাদের সহযোগী যারা হুকুমদাতা ছিল তারা এবং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় যারা যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

এই মামলার আসামি ১৩ জন। এর মধ্যে ১২ জনই বর্তমান-সাবেক সেনাকর্মকর্তা। আসামিদের মধ্যে তিনজন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

মামলার বাকি ১০ আসামি পলাতক। পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক।

পলাতক আসামিদের মধ্যে আরো আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এই মামলার আসামি।