মাঠে ঘাম ঝরান কৃষক, মুনাফা কার পকেটে?

১০ টাকার সবজি ঢাকায় ৬০ টাকা

Printed Edition

কাউসার আযম

মাঠে ঘাম ঝরিয়ে সবজি ফলাচ্ছেন কৃষক, কিন্তু ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে প্রায় একই চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। ক্ষেত থেকে তুলেই যেখানে কেজিপ্রতি সবজি বিক্রি হচ্ছে ৫-১০ টাকায়, রাজধানী ঢাকায় সেই সবজিই বিক্রি হচ্ছে ৪০-৬০ টাকায়। এই বড় মূল্য ব্যবধানের মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে সবজির প্রকৃত লাভ যায় কার পকেটে? কৃষকের ক্ষতি ও ভোক্তার অতিরিক্ত খরচের মাঝখানে মুনাফা যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেটের হাতে।

দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম- প্রায় সব জেলায় একই চিত্র। নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম চলতি মৌসুমে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছেন। তিনি জানান, আড়তে ফুলকপি কেজিপ্রতি ৬-৭ টাকার বেশি কেউ নেয়নি। অথচ ঢাকার খুচরা বাজারে একই ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়। রফিকুল বলেন, ‘সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ আর শ্রমের খরচই উঠছে না। ফসল ভালো হলেও লাভ নেই।’

একই অবস্থা কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায়। শসা, লাউ ও করল্লা চাষকারী আবদুল হাই বলেন, শসা কেজি ৮ টাকায়, লাউ ১৫-২০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ঢাকায় গেলে দেখি আমার লাউ ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাহলে লাভটা কারা নেয়?’ হিসাব অনুযায়ী, শুধু পরিবহন ও আড়তের কমিশনেই দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

রংপুরের পীরগঞ্জের বেগুনচাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শুরুতে কিছুটা ভালো দাম পেলেও এখন বেগুন কেজি ১০-১৫ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না। অথচ রাজধানীতে সেই বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়। বগুড়ার শাজাহানপুরে টমেটো চাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘টমেটো কেজি ৮-১০ টাকায় বিক্রি করছি। অনেক সময় ক্ষেতেই টমেটো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কারণ তুলেও লাভ নেই।’

দক্ষিণাঞ্চলেও চিত্র ভিন্ন নয়। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিম ও ঢেঁড়স চাষিরা জানান, স্থানীয় বাজারে দাম এতটাই কম যে ফসল তোলার খরচও উঠছে না। বরিশালের মুলাদীতে লালশাক ও পালংশাক আঁটি প্রতি ৫-৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ঢাকার বাজারে এসব শাকের আঁটি ২০-৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কৃষকের অভিযোগ, তারা সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারছেন না। স্থানীয় হাট বা আড়তই তাদের শেষ ভরসা। এখানে ফড়িয়া ও আড়তদারদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে হয়। পচনশীল পণ্য দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যায় না। ফলে আড়তে যে দাম বলা হয়, বাধ্য হয়ে সেই দামে বিক্রি করতে হয়। অনেক কৃষক বলছেন, আড়তগুলোতে সিন্ডিকেট করে দাম নির্ধারণ করা হয়, কৃষকের কোনো দরকষাকষির সুযোগ থাকে না।

রাজধানীর প্রধান পাইকারি বাজার- কাওরানবাজার, যাত্রাবাড়ী, শ্যামবাজার ও কাপ্তানবাজার- ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকভর্তি সবজি আসে। এখানে আড়তদাররা কমিশন কেটে পাইকারদের কাছে সবজি ছাড়েন। এরপর পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বিক্রেতার হাতে পৌঁছাতে দাম আরো বেড়ে যায়। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পরিবহন খরচ, আড়ত ভাড়া, চাঁদা, নষ্টের ঝুঁকি এবং শ্রম ব্যয় যোগ করে দাম বাড়ে। তবে বাস্তবতা হলো, এই দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে কৃষকই সবচেয়ে কম অংশ পান।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সবজি বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব এ পরিস্থিতির মূল কারণ। কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামে কিনে স্বল্প ব্যবধানে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর কোনো সংগঠিত ব্যবস্থা নেই। সরকারি বিপণন সংস্থা বা সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বেসরকারি আড়ত ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উৎপাদনপর্যায়ে কৃষকের প্রাপ্ত দাম ও খুচরাপর্যায়ের দামের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এই ব্যবধান ইঙ্গিত দেয়, লাভের বড় অংশ যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। তারা বলেন, যদি কৃষক ন্যায্য দাম পান, উৎপাদনে আগ্রহ বাড়বে এবং একই সাথে ভোক্তাও তুলনামূলক কম দামে সবজি কিনতে পারবে।

কৃষি বিপণন অধিদফতরের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, কৃষক থেকে ভোক্তার সরাসরি সংযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষকের বাজার, ভ্রাম্যমাণ ট্রাক সেল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা হলো, এসব উদ্যোগ এখনো সীমিত, অধিকাংশ কৃষক সুফল পাচ্ছেন না।

সবজির এই মূল্য বৈষম্যের প্রভাব পড়ছে দুই দিকেই। এক দিকে কৃষক ঋণগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত, অন্য দিকে শহরের সাধারণ মানুষ বাড়তি খরচে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি কিনতে বাধ্য। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষক সমবায় শক্তিশালী করা, সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করা, আড়ত ও ফড়িয়াদের কমিশন নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং জোরদার না করলে এই সঙ্কট কাটবে না।

মাঠ থেকে রাজধানী ঢাকার দীর্ঘ যাত্রাপথে কৃষক ক্রমেই বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসলের প্রকৃত লাভ যদি কৃষকের হাতে না গিয়ে অন্যের পকেটে যায়, তাহলে এই বাজার ব্যবস্থার টেকসই হওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হলে কৃষক ও ভোক্তা- দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত থাকবেন।