অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দরপতনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই পুঁজিবাজারে নতুন সপ্তাহ শুরু হয়েছে। আগের সপ্তাহের রেকর্ড দরপতনের পর নতুন সপ্তাহে একই আচরণ করছে পুঁজিাবজারগুলো। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্ম দিবসে লেনদেনের শুরু থেকে বিক্রয়চাপ অস্থির করে তোলে দুই বাজারকে। এরই মাঝে বাজারগুলো দু-একবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও শেষদিকে এসে বিক্রয়চাপ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এতে দিনশেষে উভয় বাজারই বড় ধরনের সূচক হারায়।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৭৫ দশমিক ০৭ পয়েন্ট হারায়। ৫ হাজার ১১৯ দশমিক ৪১ পয়েন্ট থেকে সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৪৪ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ২৯ দশমিক ৭৩ ও ২৩ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১৯৪ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স যথাক্রমে ১২৪ দশমিক ০৩ ও ১১৩ দশমিক ৬১ পয়েন্ট হারায়।
গতকাল শুরুতে কিছু কিছু কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেলেও বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে ফের দরপতনের শিকার হতে দেখা যায়। এ সময় সব খাতেরই সমান তালে দরপতন ঘটতে থাকে। দিনের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশ কয়েকটি খাতে শত ভাগ কোম্পানিই এ সময় দর হারায়। এগুলো ছিল সিমেন্ট, সিরামিকস, পাট, পেপার, চামড়া, টেলিকমিউনিকেশন ও বিবিধ খাত। এ ছাড়া ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, ওষুধ, বস্ত্র ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বড় খাতগুলোতে দরপতনের শিকার ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ কোম্পানি। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ৩৯৬টি শেয়ারের মধ্যে ৪৪টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ৩১৪টি, যা লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে খুবই অনাকাক্সিক্ষত মনে করছেন। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীরা কিসের ভিত্তিতে এভাবে বিক্রয় বাড়িয়ে দিচ্ছেন তার কোনো যৌক্তিকতা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। এটা যদি মার্জিন রুলস সংশোধনীর কারণে ঘটে থাকে তাও এ মুহূর্তে খুব একটা যৌক্তিক বলা যায় না। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সংশোধনী প্রস্তাবের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আশ^স্ত করেছে যে, সংশোধনী পাস হলে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের হিসাব সমন্বয়ে এক থেকে দেড় বছর সময় পাবেন। তাই বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি উৎকণ্টার কারণ নেই। তা ছাড়া যে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি তা নিয়ে এভাবে নিজেদের কষ্টার্জিত পুঁজি নষ্ট করার মানে হয় না। পৃথিবীর কোথাও কোনো কারণ ছাড়া পুঁজিবাজারে এভাবে দরপতনের কথা শোনা যায় না উল্লেখ করে তরা বলেন, আমি যদি নিজেই আমার মূলধন নষ্ট করি তা হলে কারো কিছুই করার থাকে না। তাই এ অবস্থায় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার বিকল্প নেই।
সূচকের পাশাপশি গতকাল ডিএসইর লেনদেনও বিগত তিন মাসের মধ্যে সর্বনি¤œ অবস্থানে নেমে আসে। ডিএসই গতকাল ৪৪২ কোটি টাকার লেনদেন হয়। গত ২৫ জুনের পর বাজারটির লেনদেন আর এ পর্যায়ে নামেনি। তবে প্রতি দিন যে হারে বাজার দরপতনের শিকার হচ্ছে তাতে লেনদেনের এ গতিও হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বরাবরই সূচকের টানা অবনতির শিকার হলে বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে হাত গুটিয়ে নেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে সামিট এলায়েন্স পোর্ট লি.। ২৯ কোটি ৫১ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬৯ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ১৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার শেয়ার লেনদেন করে এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল ওরিয়ন ইনফিউশন লি.। তৃতীয় স্থানে থাকা বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকার। এ ছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে আরো ছিল ডোমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লি. এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড, প্রগতি লাইফ ইন্সুরেন্স পিএলসি, রবি আজিয়াটা, প্রগতি ইন্সুরেন্স লি. সিভিও পেট্রো কেমিক্যাল রিফাইনারি পিএলসি এবং সোনালী পেপার বোর্ড মিলস লিমিটেড।
গতকাল বাজারটির দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসি। কোম্পানিটির শেয়ার দর ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৮ দশমিক ৭০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে দর বৃদ্ধির এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড। তৃতীয় স্থানে থাকা একমি পেস্টিসাইড লিমিটেডের শেয়ার দর বেড়েছে ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
দর বৃদ্ধির শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ, বিএসআরএম লিমিটেড ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ডোরিন পাওয়ার জেনারেশন্স অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস্থ লিমিটেড ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ, ডেফোডিল কম্পিউটারস পিএলসি ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ-এর ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ দর বেড়েছে।
দরপতনের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে মুন্নু এগ্রো অ্যান্ড জেনারেল মেশিনারি লিমিটেড। কোম্পানিটি গতকাল ৫ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করায় ১৪ দশমিক ২৪ শতাংশ দরপতনের শিকার হয়। ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ দর হারিয়ে এ দিন দরপতনে দ্বিতীয় স্থানে ছিল খান ব্রাদাস্থ পি.পি. ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তৃতীয় স্থানে থাকা প্রগতি ইন্সুরেন্স লি.-এর শেয়ার দর ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া, ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে এইচ আর টেক্সটাইল লি. ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, নিউ লাইন ক্লোথিংস লিমিটেড ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, জেমিনী সি ফুড পিএলসি ৯ দশমিক ০১ শতাংশ, সামিট এলায়েন্স পোর্ট লি. ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ, ন্যাশনাল ফিড মিল লিমিটেড ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ, পাইওনিয়ার ইন্সুরেন্স কোম্পানি লি. ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং সেনা ইন্সুরেন্স পিএলসির দর ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছে।



