ছাত্র-জনতার ক্ষোভের আগুনে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন ভবনের ভেতর ও বাইরে হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা ঢুকে ভাঙচুর চালান। লুটপাটের ঘটনাও ঘটে সংসদ ভবনের ভেতরে। ছাত্র-জনতা সংসদ অধিবেশন কক্ষ, শপথকক্ষ এবং স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের কক্ষসহ ৯তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষই তছনছ করেন। অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেমসহ এমপিদের বসার অনেক আসন (চেয়ার) ও টেবিল ভেঙে ফেলা হয়। আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান হওয়ার প্রায় ১১ মাস অতিবাহিত হচ্ছে। আগামী ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের এক বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু এখনো বিধ্বস্ত জাতীয় সংসদের সংস্কার বা মেরামতকার্যক্রম শুরু হয়নি।
জানা যায়, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। জাতীয় নির্বাচন শেষে নির্বাচিত নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশন বসবে। ফেব্রুয়ারি কিংবা রোজার ঈদের পরে এপ্রিলে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসতে পারে। এমন সম্ভাবনা ধরে সংসদের সব কার্যক্রম যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে করা যায় সে লক্ষ্যে মেরামত ও ক্রয় কার্যক্রম জরুরি ভিত্তিতে শেষ করতে গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছে সংসদ সচিবালয়। এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো: কামাল উদ্দিন বিশ^াস গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে সংস্কার বা মেরামতের কাজ সম্পন্নের জন্য নির্দেশনা দেয়া আছে। এটা (সংস্কার/মেরামত) গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন। তাই তাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে বলেন তিনি।
সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সংসদ ভবন ও সংসদের আবাসিক স্থাপনায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় শ’ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংসদ সচিবালয়ের নিজস্ব খাতের ক্ষতি হয়েছে ৫০ কোটি টাকার মতো। অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকা। সংসদ সচিবালয়ের আইটি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের নিজস্ব বাজেট থেকে কিছু জরুরি কম্পিউটার কিনে স্বল্পপরিসরে কাজ শুরু করা হয়েছে। কিছু কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ঠিক করা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে বাকি কাজ করবে গণপূর্ত বিভাগ। সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থিত মন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের কার্যালয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসভবনও ভাঙচুর করা হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা কম্পিউটার, আসবাবপত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ ও দামি জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, সংসদ অধিবেশন কক্ষে এমপিদের বসার ২৭টি চেয়ার পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। এগুলো নতুন করে তৈরি করতে হবে। ক্ষোভের আগুনে পুড়ে যায় কার্পেট। তাই নতুন করে কার্পেটও বসাতে হবে। অধিবেশন কক্ষের সামনের সারির বেশির ভাগ টেবিলই ভেঙে গেছে। নষ্ট হয়েছে সাউন্ড সিস্টেম। ভেঙে ফেলা হয় টেবিলের ওপর থাকা মাইক্রোফোনগুলো। সাউন্ড সিস্টেম মেরামত করা সম্ভব না হলে এটা নতুন কিনতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মেরামতের জন্য সংসদের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদফতরের কাঠের কারখানা বিভাগ ৪৯ কোটি টাকা ও সিভিল কাজের জন্য ২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। এ ছাড়া ই/এম বিভাগ প্রায় ২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। সংসদ ভবন, ভিআইপি ও কর্মকর্তাদের বাসভবন এবং এমপি হোস্টেল মেরামতের জন্য এই বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
গত ৯ মার্চ সংসদ সচিবালয়ের তখনকার সচিব মো: মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণপূর্ত সিভিল, ই/এম ও কাঠের কারখানা বিভাগের কাজের অগ্রগতিবিষয়ক সভায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদ ভবন ও এর অধীন বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি ও মেরামত সম্পর্কিত তথ্য তুলে ধরেন।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সাইমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটিশন সিস্টেম (এসআইএস) এবং অধিবেশন কক্ষের সাউন্ড সিস্টেম মেরামত অথবা নতুন সিস্টেম স্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম, আর্চওয়ে ও ব্যাগেজ স্ক্যানার জরুরি ভিত্তিতে ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ সময় সচিব অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সব মেরামত, সংস্কার ও ক্রয় কার্যের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত তার কাছে দিতে বলেন।



