অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর ফাঁকি, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

শাহ আলম নূর
Printed Edition

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দ্রুত বিকশিত বাংলাদেশে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং একটি সম্ভাবনাময় আয়ের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এই খাতের বড় একটি অংশ এখনো করের আওতার বাইরে থাকায় সরকারের রাজস্ব আয়ে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আয় নিরূপণের জটিলতা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং কর-সচেতনতার ঘাটতির কারণে ফ্রিল্যান্সিং আয়ের একটি বড় অংশ কর ফাঁকির মধ্যে থেকে যাচ্ছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ৬ থেকে ৭ লাখ। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং খাত থেকে প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আয় দেশে এসেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই আয়ের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে না আসায় প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফ্রিল্যান্সিং আয়ের একটি অংশ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে, ডিজিটাল ওয়ালেট বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দেশে আসছে, যা সবসময় সঠিকভাবে নথিভুক্ত হচ্ছে না। ফলে এই আয়ের ওপর কর আরোপ ও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ফ্রিল্যান্সিং খাত আমাদের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে; কিন্তু এই খাত যদি করের আওতার বাইরে থাকে, তাহলে সরকার রাজস্ব হারাবে। একইসাথে অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক কাঠামোও দুর্বল হবে।

বর্তমানে এনবিআরের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর আরোপের নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ফ্রিল্যান্সার তাদের আয় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করেন এবং তা আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেন না। আবার অনেকেই মনে করেন, বৈদেশিক আয় হওয়ায় এটি করমুক্ত, যা পুরোপুরি সঠিক নয়।

এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্রিল্যান্সিং আয় করযোগ্য, তবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কর ছাড় বা রেয়াত থাকতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, আয় ঘোষণা না করেই তা ব্যবহার করা হচ্ছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন আপওয়ার্ক, ফাইবার এবং ফ্রিল্যান্স ডটকম থেকে আয় করা অর্থ বিভিন্ন উপায়ে দেশে আনা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই আয় সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে দেশে না এসে স্থানীয়ভাবে নগদায়ন করা হচ্ছে, যা নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ মাজেদুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে কর ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হবে। না হলে নতুন আয়ের উৎসগুলো থেকে সরকার কাক্সিক্ষত রাজস্ব পাবে না। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থার জটিলতা এবং পরিষ্কার নির্দেশনার অভাব উদ্যোক্তাদের কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করছে। অনেকেই জানে না কিভাবে কর দিতে হয়। আবার অনেক সময় আয় প্রমাণের কাগজপত্র জোগাড় করাও কঠিন হয়।’

অন্য দিকে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, অতিরিক্ত কর চাপ দিলে এই খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তারা প্রণোদনা ও সহজ কর কাঠামোর মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সফটওয়্যার ও তথ্য সেবা সমিতির এক প্রতিনিধি বলেন, ফ্রিল্যান্সিং খাতকে উৎসাহ দিতে হবে, তবে একই সাথে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এজন্য সহজ ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রিল্যান্সিং আয়ের কর ফাঁকি রোধে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও ব্যাংকের মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করতে হবে, যাতে আয় সঠিকভাবে ট্র্যাক করা যায়। দ্বিতীয়ত, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহজ কর রিটার্ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, কর সচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা প্রয়োজন।

ইন্টারন্যাশনাল মনিটরিং ফান্ডের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সাথে সাথে কর প্রশাসনকে আরো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে, নতুবা কর ফাঁকির ঝুঁকি বাড়বে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার একটি বড় অংশ আয়কর থেকে আসার কথা। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো উদীয়মান খাতগুলো যদি পুরোপুরি করের আওতায় না আসে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ফ্রিল্যান্সিং খাতকে দমন নয়, বরং সঠিকভাবে নিয়মের মধ্যে এনে উৎসাহ দেয়া উচিত। এতে এক দিকে যেমন রাজস্ব বাড়বে, অন্য দিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং আয়ের কর ফাঁকি রোধে সরকার, কর প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত এবং ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতকে দেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করা সম্ভব।