পৃথিবীর অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়। ১২৭ বছরের পুরনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্মানিত হলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় সকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে সম্মানসূচক পিএইচডি প্রদান করে।
এর আগে বাংলাদেশী শিক্ষার্থী এবং পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের চীনা শিক্ষার্থীরা অভ্যর্থনা জানান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। সাদরে বরণ করে নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট গোং চি হোয়াং। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়া হয় পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। পরে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন তার ‘থ্রি জিরো’ ধারণা। কিভাবে টেকসই বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোনো যায়, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনাও দেন প্রধান উপদেষ্টা।
ড. ইউনূস ২০০৬ সালে অনারারি অধ্যাপক ছিলেন পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। বক্তব্যে সেই সময়কার স্মৃতিচারণ করেন তিনি। বলেন, চীন-বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বের সাথে স্থান পাবে শিক্ষা বিনিময়ে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বিশ্বকে বদলে দিতে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু শেখার জায়গা নয়, এটি স্বপ্ন দেখারও জায়গা।’ স্বপ্ন দেখতে পারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি স্বপ্ন দেখেন, তবে তা ঘটবেই। আপনি যদি স্বপ্ন না দেখেন, তবে তা কখনো ঘটবে না।’
শিক্ষার্থীদের অতীতের দিকে নজর দেয়ার অনুরোধ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘যা কিছু ঘটেছে, কেউ না কেউ আগে তা কল্পনা করেছিল।’ তিনি বলেন, ‘কল্পনা যেকোনো কিছু থেকে বেশি শক্তিশালী।’ তিনি শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং অকল্পনীয় বিষয়ে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেন, যদিও অনেক সময় এটি অসম্ভব মনে হতে পারে। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘কিন্তু, মানবসভ্যতার যাত্রা হলো অসম্ভবকে সম্ভব করা। সেটাই আমাদের কাজ। আর আমরাই তা করতে পারি।’
অনুষ্ঠানে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিলের সভাপতি হে গুয়াংচাই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট গং চিহুয়াং বক্তব্য রাখেন।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভাষণে বলেন, তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের ঘর মনে করেন। কারণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্মানসূচক অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উদ্ভাবন ও উৎকর্ষতার কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করতে পেরে আমি গর্বিত।’ তিনি বলেন, এই সম্মাননা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় তার সেই প্রতিশ্রুতির কথা, যা তিনি গত বছর বাংলাদেশে রূপান্তরকারী পরিবর্তনের অগ্রভাগে থাকা লাখ লাখ যুবকের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য করেছিলেন।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তাদের স্বপ্ন ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার, যে দেশটি দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা তার সরকারের সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যেখানে উদ্যোক্তা বিকাশকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। ড. ইউনূস বলেন, ‘মানুষ জন্মগতভাবে দরিদ্র নয়, বরং ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে দরিদ্র হয়ে পড়ে, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে না।’ তিনি বলেন, সমাজে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণার কারণেই মানুষ কষ্ট ভোগ করে। তিনি বলেন, মানুষ জন্মগ্রহণ করে চাকরি খোঁজার জন্য নয়, বরং তারা সৃষ্টিশীল। মানুষকে চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সকল মানুষই উদ্যোক্তা।’ নারীদের বিপুল সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নোবেল বিজয়ী এ অর্থনীতিবিদ বলেন, এমনকি বাংলাদেশের দরিদ্রতম নারীও মাত্র ২০ মার্কিন ডলার ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারে। তিনি আরো বলেন, নারীরা বিশ্বের যেকোনো জায়গায় উদ্যোক্তা হতে পারেন।
শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত? শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে বিশ্বকে পরিবর্তন করা।’ বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে কার্বনমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা তার ‘তিন শূন্য তত্ত্ব’- শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও সামাজিক ব্যবসার ওপরও আলোকপাত করেন, যা সমাজের সমস্যাগুলো সমাধান করে। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা কার্বন নির্গমনে অবদান না রাখে। তিনি বলেন, সবারই নিজেদেরকে ‘তিন শূন্য’ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। তিনি জানান, নতুন বাংলাদেশ গড়তে সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক সরকার আনার পথে হাঁটছে সরকার। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালার কথা বলে তিনি আরো জানান, প্রত্যেক ব্যক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করছে বর্তমান সরকার।
এ দিকে চার দিনের সফর শেষে গত রাতে ঢাকায় ফেরেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এয়ার চায়নার বাণিজ্যিক বিমান গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৫৭ মিনিটে বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের চিফ প্রোটোকল অফিসার হং লেই বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে বিদায় জানান।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৭ মার্চ চীনের হাইনান প্রদেশে আয়োজিত বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া (বিএফএ) সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনের ফাঁকে তিনি বেশ কয়েকটি বৈঠকও করেন। শুক্রবার বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।



