নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে কাজ করা ৩৭টি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার ওপর ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেঁস। শুক্রবার আলজাজিরার বরাতে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এসব সংস্থা জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে চলমান যুদ্ধবিরতির অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ইসরাইল নতুন নিবন্ধন আইনের আওতায় এসব সংস্থাকে কর্মীদের বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বলেছে, যা মানবিক নীতির পরিপন্থী বলে অভিযোগ উঠেছে। এমএসএফ, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলসহ একাধিক সংস্থা এই তালিকায় রয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মতে, এই সিদ্ধান্ত গাজার মানবিক সঙ্কট আরো ভয়াবহ করে তুলবে।
এনজিও নিষেধাজ্ঞা না তুললে মার্চে কার্যক্রম বন্ধ করবে এমএসএফ : গাজা উপত্যকায় ৩৬টি সাহায্য সংস্থার সাথে নিষিদ্ধ হয়েছে চিকিৎসা সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা ডাক্তারস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)। গতকাল শনিবার তারা সংবাদ সংস্থা আল আরাবিয়াকে জানিয়েছে, ইসরাইল সিদ্ধান্ত না বদলালে মার্চ মাসে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেঁস শুক্রবার ইসরাইলকে আহ্বান জানিয়েছেন মানবিক সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে। তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইসরাইল বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে যে তারা ৩৭টি বড় আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাকে গাজায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এসব সংস্থা তাদের কর্মীদের নামের তালিকা জমা দেয়নি, যা এখন নিরাপত্তাজনিত কারণে বাধ্যতামূলক।
এমএসএফ এই দাবিকে ‘অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেছে। তবে ইসরাইল বলছে, মানবিক কাঠামোয় চরমপন্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে এ পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ফ্রান্স ইন্টারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমএসএফ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও চিকিৎসক ইসাবেল দেফুরনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনে কাজ করতে হলে নিবন্ধিত থাকতে হয়। আমাদের নিবন্ধন ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে। জুলাই ২০২৫ থেকে আমরা পুনঃনিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় আছি, কিন্তু এখনো কোনো উত্তর পাইনি। সামনে ৬০ দিন আমরা নিবন্ধন ছাড়া কাজ করতে পারব। এর পর মার্চে কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে যদি ইসরাইল সিদ্ধান্ত না বদলায়।’ এমএসএফ বর্তমানে গাজায় প্রায় ৪০ জন আন্তর্জাতিক কর্মী এবং ৮০০ জন ফিলিস্তিনি কর্মীর সাথে আটটি হাসপাতালে কাজ করছে।
ইসাবেল দেফুরনি আরো বলেন, ‘আমরা গাজায় দ্বিতীয় বৃহত্তম পানি সরবরাহকারী। গত বছর ২০২৫ সালে আমরা এক লাখের বেশি আহত, দগ্ধ ও বিভিন্ন ট্রমার শিকার মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছি। প্রসবের সংখ্যায়ও আমরা দ্বিতীয় অবস্থানে।’ তার মতে, ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তের কারণ হলো এনজিওগুলো গাজায় ইসরাইলি সেনাদের সহিংসতার সাক্ষ্য বহন করে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা
উত্তর গাজায় গতকাল শনিবার ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে এক ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের নতুন ঘটনা বলে জানিয়েছে চিকিৎসা সূত্র। আনাদোলুকে দেয়া তথ্যে জানানো হয়, নিহত শিশুর নাম ফাতিমা মারুফ। বয়স ১১ বছর। তাকে গুলি করে হত্যা করা হয় গাজা উপত্যকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বেইত লাহিয়ায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মেয়েটি শহরের একটি নির্ধারিত নিরাপদ এলাকায় ছিল। যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলি সেনারা ওই এলাকা থেকে সরে গিয়েছিল। সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
চিকিৎসা সূত্র আরও জানায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের নাসের হাসপাতালের কাছে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আরেকজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। ওই এলাকা থেকেও সেনারা যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী সরে গিয়েছিল। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের পূর্বদিকে ইসরাইলি সামরিক যানবাহন নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি সেনারা শত শতবার লঙ্ঘন করেছে। এসব ঘটনায় ৪১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১১৭১ জন আহত হয়েছেন।
গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ সালে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরাইলের দুই বছরের যুদ্ধ থামায়। সেই যুদ্ধে প্রায় ৭১ হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছিলেন আরো এক লাখ ৭১ হাজার ২০০ জন। পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলের প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রয়েছে।
শীত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় সবচেয়ে বেশি ভুগছে আহত ও শিশুরা
তীব্র শীত ও বৃষ্টিতে গাজায় মানবিক দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধাহত শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন। খবর আলজাজিরার। ৯ বছর বয়সী আসাদ আল-মাধনা, যিনি ইসরাইলি হামলায় হাত হারিয়েছেন, ঠাণ্ডার কারণে তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছেন। শরীরে থাকা ধাতব রড ও পিন ঠাণ্ডায় আরো অসহনীয় হয়ে উঠছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষ বাড়ি-ঘর হারিয়েছে। পর্যাপ্ত তাঁবু ও শীতবস্ত্র না থাকায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হচ্ছে।
এনজিও নিষেধাজ্ঞা ও শীতকালীন দুর্যোগে প্রাণহানির আশঙ্কা
গাজায় আন্তর্জাতিক এনজিও কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্ত ও শীতকালীন দুর্যোগ এক সাথে পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলছে। এপি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে তাঁবু ধসে পড়া, ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতা এবং আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। বৃহস্পতিবার একটি তাঁবুতে আগুন লেগে এক দাদী ও তার পাঁচ বছরের নাতির মৃত্যু হয়।
কাতার, মিসর, সৌদি আরব, তুরস্কসহ একাধিক দেশ ইসরাইলকে অবিলম্বে বাধাহীন মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে। তারা সতর্ক করেছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গাজায় বেসামরিক প্রাণহানি আরো বাড়বে।



