বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সঙ্কট, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং তরুণদের বেকারত্বের চাপে জর্জরিত। এই সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতি উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলো কি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে সে দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখায় ব্যবসায়ীদের জন্য সরাসরি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দফা ১৫-এ অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমানো; দফা ১৭-এ শ্রমিকদের মজুরি মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, বন্ধ কারখানা খোলা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা; দফা ১৮-এ জ্বালানি খাতে দুর্নীতি বন্ধ, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপচয় রোধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসার এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান ও পরিকল্পিত শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা; দফা ১১-এ প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।
গত ৪ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে দেশের শীর্ষ ৩০ জন ব্যবসায়ী নেতার সাথে একটি বৈঠক করেন। বৈঠকে বিনিয়োগ স্থবিরতা, জ্বালানি সঙ্কট, আইনশৃঙ্খলা, ব্যাংকিং সুদের হার, পুঁজিবাজার শক্তিশালীকরণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে তারেক রহমান আশ্বাস দেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস বন্ধ করে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, জ্বালানি সঙ্কটকে অগ্রাধিকার, ব্যবসায়িক খরচ কমানো, সরকারি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস করে বেসরকারি খাতকে নেতৃত্ব দেয়া এবং খাতভিত্তিক পরিকল্পনায় ব্যবসায়ীদের সাথে পরামর্শ চালানো হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন স্থগিতের সুযোগ থাকলে তা করা হবে বলেও জানানো হয়। ব্যবসায়ীরা তারেকের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে তাদের চিন্তা মিলে যাওয়ার কথা বলেন।
কিছু দিন আগে বাংলাদেশ ইকোনমিক সামিটে বিএনপির নেতারা অর্থনীতিকে সবার জন্য গড়ে তোলা এবং স্বাবলম্বী অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানকে ম্যানিফেস্টোর কেন্দ্রে রাখার কথা বলেছেন। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির আগামী নির্বাচনে সরকার গঠন করলে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দলের দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক সেøাগান নয়; বরং বিনিয়োগনির্ভর, কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক মডেলের অংশ।
বিএনপির দর্শন : কর্মসংস্থান বনাম প্রবৃদ্ধি
বিএনপির নেতারা বিগত সময়ের উন্নয়নকে ‘জবলেস গ্রোথ’ বলে সমালোচনা করেন। জিডিপি বৃদ্ধি হয়েছে, মেগা প্রকল্প হয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। প্রবৃদ্ধির সুফল সরাসরি মানুষের হাতে পৌঁছাতে হবে- এটাই দলের মূল দর্শন।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, তরুণদের কর্মক্ষম না করলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। পরিকল্পনার কেন্দ্রে জেনারেশন জেড (১৩-২৮ বছর বয়সী)। তিনটি স্তম্ভ : আত্মকর্মসংস্থান, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান।
১ কোটি চাকরির খাতভিত্তিক হিসাব : তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতকে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং ডিজিটাল সার্ভিসে তরুণদের যুক্ত করে বিশ্ববাজারের আউটসোর্সিং সুযোগ কাজে লাগানো হবে। তৈরী পোশাকের পাশাপাশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্লাস্টিক ও ভ্যালু-অ্যাডেড কৃষিপণ্য খাতে নতুন শিল্প গড়ে তোলা হবে। কৃষিতে আধুনিকায়ন, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, কোল্ড স্টোরেজ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ানো হবে। পর্যটন খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, হোটেল-রিসোর্ট ও সেবা সম্প্রসারণ করা হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বিস্তৃত করা হবে ।
বিনিয়োগ ছাড়া সম্ভব নয় : বিএনপির গবেষণা উইং বিএনআরসির সাথে জড়িত এক নেতা বলেন, বিনিয়োগভিত্তিক পথই টেকসই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লাইসেন্স ও কারেন্সি সমস্যা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা হবে। অতীতে বেসরকারি খাতের বিকাশ ও বাজারভিত্তিক সংস্কার বিএনপির সময়েই হয়েছে বলে তাদের দাবি।
বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন : অর্থনীতিবিদরা ১৮ মাসে এক কোটি চাকরিকে উচ্চাভিলাষী মনে করেন। বড় বিনিয়োগ আকর্ষণে সময় লাগে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সঙ্কট, ডলার অভাব চ্যালেঞ্জ। চাকরির মান, টেকসইতা ও তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ কঠিন। বাংলাদেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী প্রায় চার কোটি ৬০ লাখ তরুণ শুধু চাকরির সংখ্যা নয়, মানসম্মত চাকরি, আয় ও ক্যারিয়ার চায়।
বিএনপির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নির্ভর করবে রাজনৈতিক ক্ষমতা, স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক পরিবেশের ওপর। ব্যবসায়ীদের সাথে সংলাপ, ৩১ দফার অর্থনৈতিক অংশ এবং এক কোটি চাকরির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। তবে সঙ্কট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ ও সব পক্ষের সহযোগিতা অপরিহার্য।



