বিশেষ সংবাদদাতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের জ্বালানি বাজারে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে জ্বালানি তেল নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা যেমন বেড়েছে তেমনি বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় অবৈধ মজুদ, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা ঠেকাতে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ টহল বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
গতকাল রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এতে জেলা প্রশাসকদের মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করে জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির আশঙ্কা : সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্কটকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির উদ্দেশ্যে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুদ করছে, এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে এবং বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়তে পারে এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ : জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং খোলাবাজারে তেল বিক্রির মতো অনিয়ম বন্ধ করতে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম তদারকি করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পেট্রলপাম্প ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফার আশায় তেল মজুদ বাড়ানো এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচারের প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব অনিয়ম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ : বাজারে অস্বাভাবিক চাপ কমাতে সরকার ইতোমধ্যে যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি বিক্রির পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। এর ফলে একবারে বড় পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ব্যবস্থা মূলত অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা ও অননুমোদিত মজুদ বন্ধ করার জন্য নেয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তারা আতঙ্কের কারণে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
ফিলিং স্টেশনে বাড়ছে ভিড় : সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল কেনাকে কেন্দ্র করে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। অনেক জায়গায় ক্রেতা ও স্টেশনকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রচারের কারণে ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেকেই অতিরিক্ত তেল কিনতে ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছেন। ফলে স্টেশন ডিলাররা আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
অতিরিক্ত মজুদের প্রবণতা বাড়ছে : বিপিসি আরো জানিয়েছে, কিছু ভোক্তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কিনে অননুমোদিতভাবে মজুদ করার চেষ্টা করছেন। এ প্রবণতা বাড়তে থাকলে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ সীমিত করার বিষয়ে বিপিসি ইতোমধ্যে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্কের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা শুরু হলে তা দ্রুতই বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করতে পারে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সরকার : জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব যাতে দেশের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে, সে জন্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বাজারে কেউ যেন কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করতে না পারে এবং ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারেন- সে লক্ষ্যে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পেট্রোল পাম্পে পুলিশ চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি : জ্বালানি তেল বিপণনে ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশি টহল জোরদার করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
গতকাল রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এ চিঠিতে বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেল বিপণনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে ডিলাররা বিগত সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তা ছাড়া কিছু কিছু ভোক্তা ডিলার/ফিলিং স্টেশন থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুদ করার চেষ্টা করছেন বলে খবর প্রকাশ হচ্ছে।
এরই মধ্যে ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তা প্রান্তে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সীমিতকরণ করে বিপিসি থেকে একটি প্রেস রিলিজ জারি করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিদ্যমান সঙ্কটকালে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের ক্রেতাদের সাথে ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের বিভিন্ন ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা সৃষ্টি হচ্ছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে পুলিশি টহল জোরদার করা প্রয়োজন।
এমতাবস্থায়, দেশের সব ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশি টহল জোরদার করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।
জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশ : আজ থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ
আজ সোমবার থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বিদ্যুৎসাশ্রয়ের জন্য ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে এনে আজ সোমবার থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্দেশনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করা প্রয়োজন। এ জন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং পবিত্র রমজান উপলক্ষে আজ ৯ মার্চ থেকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক ক্যালেন্ডারে উল্লিখিত তারিখ পর্যন্ত সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ থাকবে মর্মে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহিত করতে হবে’।
নির্দেশনায় আরো বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্দেশনাসমূহ প্রতিপালনের জন্য নির্দেশনাগুলো হলো- দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার পরিহার করতে হবে এবং প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করতে হবে। বিদ্যমান ব্যবহৃত আলোর অর্ধেক ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইটের ব্যবহার পরিহার করতে হবে।’ এ ছাড়াও অফিস চলাকালীন প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইট, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হবে। এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার উপরে রাখতে হবে। অফিস কক্ষ ত্যাগ করার সময় কক্ষের বাতি, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ করতে হবে।
নির্দেশনার তথ্য, ‘অফিসের করিডোর, সিঁড়ি, ওয়াশরুম ইত্যাদি স্থানে অপ্রয়োজনীয় বাতি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। অফিস সময় শেষ হওয়ার পর সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি (লাইট, ফ্যান, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি) বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে। যাবতীয় আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে। গাড়ির ব্যবহার সীমিত করতে হবে। জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।’



