‘রাতাবোরো’ ও ‘পনির’ নিয়ে জেগে উঠেছে স্বপ্ন

আজ কিশোরগঞ্জে আসছেন প্রধানমন্ত্রী

মো: আল আমিন, কিশোরগঞ্জ
Printed Edition

জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর উদ্বোধন উপলক্ষে আজ কিশোরগঞ্জে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে জেলার মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা।

এই সফরে প্রধানমন্ত্রী জেলার তিন উপজেলা সদর, কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়ায় নানা কর্মসূচিতে দিনভর ব্যস্ত থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে জেলাবাসী তার কাছে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরবেন।

এর মধ্যে রয়েছে হাওরের যোগাযোগ, মিঠামইন থেকে মরিচখালি পর্যন্ত উড়াল সড়ক, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, জেলায় ইপিজেড স্থাপন, যানজট নিরসন, নরসুন্দা নদীর পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, দু’টি আন্তঃনগর ট্রেন চালু ইত্যাদি।

তবে এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দু’টি দাবি আলাদাভাবে তুলে ধরবে জেলার মানুষ। এর একটি ‘রাতাবোরো’, অপরটি ‘পনির’।

হাওরের মাটি ও মানুষের জীবন থেকে উঠে এসেছে ঐতিহ্যবাহী এই দু’টি পণ্য। রাতাবোরো হলো কিশোরগঞ্জের হাওরের জমিতে জন্ম নেয়া সুগন্ধি ধান। আর পনির মহিষের দুধ থেকে তৈরি হওয়া পণ্য। অষ্টগ্রামের কৃষকেরা শত শত বছর ধরে তৈরি করে আসছেন পনির। দুটিই এখন ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু স্বীকৃতির পরও পণ্য দু’টির উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণে বড় ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফর সামনে রেখে তাই হাওরের এই দুই ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কৃষক, পনির কারিগর, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চান, সরকার রাতাবোরো ও অষ্টগ্রামের পনিরকে শুধু স্থানীয় ঐতিহ্য হিসেবে না দেখে সম্ভাবনাময় কৃষি ও খাদ্যপণ্য হিসেবে এগুলোর প্রসারে সরকার যেন উদযোগ নেয়। জেলার মানুষের আশা, এই দু’টি পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো, মান নিশ্চিত করা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্র্যান্ডিং, বাজারজাতকরণ এবং বিদেশে রফতানির জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা অবশ্যই নেবেন প্রধানমন্ত্রী।

২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল কিশোরগঞ্জের রাতাবোরো ধান ও অষ্টগ্রামের পনির জিআই সনদ পায়। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসের অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ফৌজিয়া খান এ দু’টি পণ্যের সনদ গ্রহণ করেন।

রাতাবোরোর জন্য উদ্যোগ প্রয়োজন : রাতাবোরো কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকার পুরনো একটি ধানের জাত। রান্নার পর ভাত থেকে বিশেষ সুগন্ধ বের হয়। স্বাদেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। স্থানীয়ভাবে এর চাহিদা থাকলেও আবাদ এখনো সীমিত। কৃষকেরা বলছেন, রাতাবোরোর ভালো ও বিশুদ্ধ বীজ সহজে পাওয়া যায় না। আবার উৎপাদিত ধান বিক্রির জন্যও নির্দিষ্ট বাজার নেই। ফলে অন্য ধানের তুলনায় দাম ভালো পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় অনেক কৃষক রাতাবোরো চাষে আগ্রহী হন না।

করিমগঞ্জ উপজেলার খয়রত গ্রামের রাতাবোরো চাষি মোহাম্মদ বরজু মিয়া বলেন, স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাতাবোরোকে বাঁচাতে প্রথমে এর বিশুদ্ধ বীজ সংরক্ষণ করতে হবে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাধ্যমে বীজ সংরক্ষণ ও উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হাওরের উপযোগী এলাকায় গড়ে তোলা যেতে পারে রাতাবোরোর বীজ উৎপাদন এলাকা। ব্যাপারে সরকার প্রকল্প নিলে ভালো হয়। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের দেয়া যেতে পারে প্রণোদনা। তৈরি করা যেতে পারে প্রদর্শনী প্লট। দেয়া যেতে পারে আধুনিক চাষাবাদ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ। পাশাপাশি রাতাবোরোর ফলন ও গুণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক বলেন, “রাতাবোরোর বীজ সংরক্ষণ ও আবাদ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগের পরিকল্পনা আছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা তো কিছু করতে পারি না। এর জন্য সরকার আমাদেরকে পরিকল্পনা দিতে পারে।”

মহিষের দুধের পনির : কিশোরগঞ্জের আরেকটি জিআই পণ্য অষ্টগ্রামের পনির। অষ্টগ্রামে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর ধরে পনির তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের তথ্য। একসময় অষ্টগ্রামের পনিরের খ্যাতি ইংল্যান্ড পর্যন্ত ছড়িয়েছিল বলে জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

অষ্টগ্রামের পনিরের জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর সম্ভাবনা আরো বেড়েছে। তবে উৎপাদন এখনো অনেকটাই ঐতিহ্যনির্ভর ও পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।

পনির নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান : কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পণ্য নিয়ে তারেক রহমানের বক্তব্যও রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পুরনো স্টেডিয়ামে এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, অষ্টগ্রামের পনির সম্পর্কে অনেকে জানেন না; সঠিক পরিকল্পনা নেয়া হলে এই পনির বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের সুনামের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে আধুনিক পদ্ধতিতে হাওরের ধানের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে এবং অষ্টগ্রামের পনির বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো হবে। এখন সেই বক্তব্যের বাস্তবায়ন নিয়ে কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা আরো বেড়েছে।

পনির কারিগরদের সাথে কথা বললে অষ্টগ্রামের পনির শিল্পে বর্ষাকালে দুধের সঙ্কট এবং হিমাগারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর চাইলে অষ্টগ্রামে একটি আধুনিক দুগ্ধ ও পনির প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে। সেখানে দুধ পরীক্ষা, পনির উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

রফতানির আগে যা দরকার : কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, রাতাবোরো ও অষ্টগ্রামের পনিরকে রফতানিযোগ্য পণ্যে পরিণত করতে সরকার একটি আলাদা কর্মপরিকল্পনা নেবে।

রাতাবোরোর জন্য আধুনিক চালকল ও প্যাকেজিং কেন্দ্র এবং পনিরের জন্য আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের খাদ্যনিরাপত্তা ও মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষাগার ও সনদের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রথম পর্যায়ে প্রবাসী বাংলাদেশী অধ্যুষিত দেশগুলোতে বাজার তৈরি করা যেতে পারে। এরপর মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজারে রফতানি বাড়ানো যেতে পারে।