বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা

নির্বাচন ঘিরে দেশী-বিদেশী অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র তৎপর

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অতীতে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের জন্য যেসব অস্ত্র মজুদ করা হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। ফলে সেই অস্ত্রই আসন্ন নির্বাচনে বড় নিরাপত্তাঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার পুলিশের বড় চ্যালেঞ্জ : আইজিপি
  • পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখনো উদ্ধার বাকি ১,৩২০টি
  • সীমান্তে নজরদারি বাড়লেও পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না অস্ত্রের চালান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধজগতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চাহিদা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং সম্ভাব্য সহিংসতা ঘিরে সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রগুলো অস্ত্র মজুদের দিকে ঝুঁকছে। এই চাহিদার সুযোগ নিয়ে দেশী ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলো আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো সতর্ক করছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার মতে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অতীতে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের জন্য যেসব অস্ত্র মজুদ করা হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। ফলে সেই অস্ত্রই আসন্ন নির্বাচনে বড় নিরাপত্তাঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

গোয়েন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী চক্রগুলো এখন আর শুধু মাঠপর্যায়ের সহিংসতায় সীমাবদ্ধ নেই। ইন্টারনেটভিত্তিক হুমকি, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং হাওয়ালাভিত্তিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে চাঁদাবাজির নতুন মডেল তৈরি হয়েছে। ফলে অপরাধীদের গতিবিধি শনাক্ত করা আরো জটিল হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে অস্ত্র কেনাবেচার চেষ্টার তথ্যও গোয়েন্দাদের নজরে এসেছে।

লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র বড় উদ্বেগ

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে অতীতে লুট হওয়া পুলিশের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়া। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় লুট হওয়া পাঁচ হাজারের বেশি অস্ত্রের মধ্যে অধিকাংশ উদ্ধার হলেও এখনো এক হাজার ৩২০টি অস্ত্র উদ্ধার বাকি রয়েছে। এসব অস্ত্র যদি অপরাধী চক্রের হাতে সক্রিয় থাকে, তাহলে নির্বাচনকালীন সহিংসতার মাত্রা বহুগুণে বাড়তে পারে।

এ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর কাছে থাকা বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রেরও নির্ভরযোগ্য হদিস এখনো মেলেনি। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ধারণা, পালিয়ে যাওয়া কিছু নেতাকর্মী এসব অস্ত্র গোপনে সংরক্ষণ করে রেখেছে, যা ভবিষ্যতে নাশকতার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

বিস্ফোরণ ও প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ

সম্প্রতি কেরানীগঞ্জ ও শরীয়তপুরে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের ঘটনাকে সম্ভাব্য নাশকতার ‘রিহার্সাল’ হিসেবে দেখছেন অনেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাদের মতে, এগুলো আসন্ন নির্বাচনের আগাম বার্তা হতে পারে। একইভাবে রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়া এবং সর্বশেষ বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মো: আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। শুধু রাজধানী নয়, জেলাপর্যায়েও প্রকাশ্য দিবালোকে গুলির ঘটনা বাড়ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভোটকেন্দ্রে সাধারণ ভোটারের উপস্থিতি কমে যেতে পারে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

সীমান্তে নজরদারি, তবুও চোরাচালান

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বারবার পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং অবৈধ অস্ত্রবিরোধী অভিযান জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো অবশ্যই উদ্বেগজনক। পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্রের অধিকাংশ উদ্ধার হয়েছে, তবে এখনো এক হাজার ৩২০টি অস্ত্র উদ্ধারের কাজ চলমান। অবৈধভাবে যেসব অস্ত্র দেশে ঢুকছে, সেগুলো উদ্ধারে যৌথবাহিনী কাজ করছে।’

গত শনিবার রাতে যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে র‌্যাব দু’টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর বাইরে পুলিশ ও বিজিবি সাম্প্রতিক সময়ে দেশী-বিদেশী অস্ত্র, বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী চাহিদা বাড়ায় চোরাচালানকারীরা নতুন রুট ও কৌশল ব্যবহার করছে।

প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের নতুন চ্যালেঞ্জ

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধজগৎ এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, এনক্রিপশন এবং আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিং নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ফলে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে। স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলো এখন আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাদের কাছে সরাসরি অস্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধির নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও সামগ্রিক নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে। তিনি জানান, কেরানীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের বিস্ফোরণগুলোর মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে এবং এগুলো নির্বাচনী সহিংসতার পূর্বাভাস হতে পারে।

যৌথ বাহিনীর অভিযান ও উদ্ধারচিত্র

আইএসপিআর জানায়, যৌথ বাহিনীর অভিযানে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ২০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১৪৯ রাউন্ড গোলাবারুদ, ১০টি ককটেল, ধারালো অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।

বিজিবি সূত্র জানায়, শুধু গত ডিসেম্বরে এক মাসেই উদ্ধার হয়েছে ৯টি পিস্তল, দুইটি এয়ারগান, ১৩টি ম্যাগাজিন, একটি হ্যান্ড গ্রেনেড, ২০ কেজি গানপাউডার, ১২ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য, ১৭ কেজি ২০০ গ্রাম পটাশিয়াম নাইট্রেট এবং ৩১৬ রাউন্ড গুলি। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মাদকও জব্দ করা হয়েছে।

নির্বাচন, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার পরীক্ষা

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, ডিজিটাল অপরাধ দমন এবং জামিনে মুক্ত শীর্ষ অপরাধীদের পুনরায় নজরদারিতে আনা না গেলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

তারা সতর্ক করছেন, এখনই সমন্বিত অভিযান না চালানো হলে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব বিস্তার আরো বাড়তে পারে। এতে শুধু নির্বাচন নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।